হিজরতের পূর্বে মদিনা (তৎকালীন ইয়াসরিব) আওস ও খাজরাজ গোত্রের দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত ছিল। এমন পরিস্থিতিতে একটি সমন্বিত ও সুশাসিত সমাজ গঠন ছিল সময়ের দাবি। মহানবী (সা.) মদিনায় পা রেখে শুধু ধর্মীয় সংস্কারে সীমাবদ্ধ থাকেননি; তিনি সামাজিক সংহতি প্রতিষ্ঠায়ও উদ্যোগী হন।
মদিনা সনদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল গোত্র ও বংশীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মদিনার সমস্ত অধিবাসীকে একটি একক রাজনৈতিক সমাজ বা ‘উম্মাহ’ হিসেবে ঘোষণা করা। এই সনদে মুসলিমদের পাশাপাশি অমুসলিম সম্প্রদায়কেও সমান নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। তৎকালীন গোত্রভিত্তিক সমাজে এটি ছিল এক অভাবনীয় চিন্তার বাস্তবায়ন, যেখানে ব্যক্তির পরিচয়ের চেয়ে নাগরিক অধিকার প্রাধান্য পেয়েছিল।
মোট ৪৭টি ধারায় গঠিত এই সনদটি একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার সমস্ত মৌলিক উপাদান ধারণ করেছিল। এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল:
পবিত্র কোরআনের ‘দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই’—এই কালজয়ী নির্দেশনার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় মদিনা সনদে। সনদের মাধ্যমে অমুসলিমদের জান-মালের পূর্ণ নিরাপত্তা, স্বকীয়তা রক্ষা এবং নিজ নিজ ধর্ম পালনের অবাধ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়।
ইউরোপীয় রাষ্ট্রদর্শনে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে থমাস হব্স, জন লক এবং জঁ-জাক রুশো কর্তৃক উপস্থাপিত ‘সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব’ (Social Contract Theory) আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। অথচ এর প্রায় এক হাজার বছর আগেই মহানবী (সা.) শাসক ও জনগণের পারস্পরিক অধিকার, কর্তব্য ও সম্মতির ভিত্তিতে মদিনা সনদ বাস্তবায়ন করেন। এই কারণেই আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ও ইতিহাসবিদদের কাছে মদিনা সনদ বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান হিসেবে সমাদৃত। বর্তমানের মেরুকৃত ও সংঘাতময় বিশ্বে বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য ও সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি মদিনা সনদের গুরুত্ব অনুধাবনে একটি বস্তুনিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ ইতিহাসবোধ প্রয়োজন:
তাই হুট করে একে আজকের যুগের কোনো আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে সরাসরি তুলনা না করে, সপ্তম শতাব্দীর ঐতিহাসিক বাস্তবতায় মূল্যায়ন করাই অধিক যুক্তিসংগত।
মদিনা সনদ মানব ইতিহাসের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার এক মহিমান্বিত মাইলফলক। ক্ষমতার দাপট বা শক্তির প্রয়োগ নয়, বরং চুক্তি, ইনসাফ ও পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যে টেকসই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব—তা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনা সনদের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন। আজকের বৈচিত্র্যময় ও সংঘাতপূর্ণ বিশ্বে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, নাগরিক অধিকার ও শান্তিময় সহাবস্থান গঠনে মদিনা সনদের মূল্যবোধ আজও এক শাশ্বত আলো ছড়ায়।
লেখক: শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

দৈনিক টার্গেট 



























