১৪ জুলাইয়ের অভ্যুত্থান
১৪ জুলাই, রাত একটা। গোটা বিশ্ব তখন ইউরো ফুটবল ফাইনালে চোখ রাখে ইংল্যান্ড এক গোল দিলেও শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে হেরে যায় স্পেনের কাছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ সেদিন চোখ রেখেছিল আরেক খেলার মাঠে রাজপথে।
কারণ এই রাতেই শুরু হয়েছিল শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ইতিহাসের এক বিস্ফোরক গণঅভ্যুত্থান।
গত বছরের এই দিনে, এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি মন্তব্য ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে দেয় তরুণ সমাজের হৃদয়ে।
তিনি বলেন, “মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা না পেলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা চাকরি পাবে?”
এই একটিমাত্র প্রশ্নেই আগুন জ্বলে ওঠে দেশের প্রতিটি কোণায়। স্বাধীনতার ৫০ বছরের বেশি সময় পরও যখন প্রজন্ম তার ন্যায্য অধিকার চাইতে গিয়ে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ অপবাদ শুনতে হয়, তখন আর চুপ থাকা সম্ভব হয়নি।
রাতভর উত্তাল হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৪ জুলাই রাত ১০টা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরজুড়ে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। প্রথমে কয়েক শ’, পরে তা হাজার ছাড়িয়ে যায়। হল গেটে তালা থাকলেও কিছুই থামাতে পারেনি সেই স্রোত তারা গেট ভেঙে, তালা ভেঙে রাজপথে নেমে আসেন।
বিশেষ করে মেয়েদের অংশগ্রহণ ছিল নজরকাড়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্রী হল থেকে তারা বেরিয়ে আসেন প্রতিবাদের মিছিলে। মধ্যরাতের সেই স্লোগানে কাঁপে পুরো ক্যাম্পাস। মিছিল গড়ায় টিএসসি থেকে ভিসি চত্বর পর্যন্ত।
অন্যদিকে, মধুর ক্যান্টিনে তখন অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ। দু’পক্ষের মধ্যে স্লোগান পাল্টাপাল্টি চললেও, সৌভাগ্যক্রমে রাতটি কোনো সহিংসতা ছাড়া কেটে যায়। কিন্তু উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে।
শাহবাগে কঠোর নজরদারি, পথে পথে বাধা
রাজপথে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে শাহবাগ পর্যন্ত। সেখানে কঠোর নজরদারি চালায় পুলিশ। বাইরে থেকে কেউ বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশ করতে পারছিল না। নিরাপত্তার নামে তৈরি করা হয় ব্যারিকেড। কিন্তু তরুণদের মনোবল ছিল অটুট।
পরদিন, ১৫ জুলাই সকালেও থেমে যায়নি প্রতিবাদ। কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দিতে বঙ্গভবনের দিকে যাত্রা শুরু করেন। পথে পথে বাধা এলেও, শেষ পর্যন্ত ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে স্মারকলিপি জমা দিতে সক্ষম হন।
“আমরা থামবো না” মুখপাত্রের ঘোষণা
আন্দোলনের মুখপাত্র নাহিদ ইসলাম সেদিন স্পষ্ট ভাষায় বলেন,
“কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আশ্বাস পাওয়া যায়নি। তাই আমরা থামছি না।”
এই বক্তব্যই ছিল সরকারের প্রতি শেষ বার্তা সময় এসেছে উত্তরদায়িত্বের।
রাজপথে জিতেছিল বাংলাদেশ
১৪ জুলাইয়ের রাত শুধু ফুটবল খেলার দিন ছিল না। এটা ছিল একটি প্রজন্মের জেগে ওঠার দিন। মাঠে ইংল্যান্ড হারলেও, রাজপথে জয়ী হয়েছিল বাংলাদেশ।
সেই রাতে শুরু হওয়া আন্দোলন শুধু শেখ হাসিনার বক্তব্যের বিরুদ্ধে ছিল না; ছিল এক দীর্ঘকালীন অবিচারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। নতুন বাংলাদেশ গঠনের ডাক ছিল সেটি যেখানে ক্ষমতার সামনে মাথা নত করবে না তরুণরা, যেখানে পরিচয়ের নামে অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে না আর।
১৪ জুলাই ২০২৪ দিনটি ইতিহাসে থাকবে শুধু একটি রাতের ঘটনায় নয়, একটি প্রজন্মের পুনর্জাগরণ হিসেবে। ফুটবলের মাঠে ইংল্যান্ড হেরে গেলেও, বাংলাদেশ সেদিন জিতেছিল গণতন্ত্রের মাঠে।
