দৈনিক টার্গেট

দেশের চেতনায়

মায়ের শূন্যতা বুকের ভেতর নীরব কান্না হয়ে বয়ে বেড়াতে হয়: শোকসভায় অশ্রুসজল চোখে শেখ শহিদুর রহমান পাভেল

মায়ের মতো এত আপন, এত মমতাময়ী আর কেউ কি আছে এই পৃথিবীতে? সেই পরম আশ্রয়, জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা, মমতাময়ী মা লতিফা রহমান (৭৫)-কে হারিয়ে আজ দিশেহারা তাঁর সন্তান ও স্বজনেরা।

চারদিকে তখন পিনপতন নীরবতা, বাতাসে যেন ভাসছিল এক কান্নার ভারী আবহ। জাতীয় প্রেস কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা ডিভিশনাল প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি এবং দৈনিক দিন প্রতিদিন-এর সিনিয়র সাংবাদিক শেখ শহিদুর রহমান পাভেলের মায়ের মৃত্যুতে আয়োজিত শোকসভা ও মিলাদ মাহফিলে উপস্থিত সবার চোখেই তখন অশ্রুর বন্যা।

শনিবার (১১ জুলাই) বিকাল ৪.০০ ঘটিকায় ১নং বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, গুলিস্তানস্থ ঢাকা ডিভিশনাল প্রেসক্লাবের নিজ কার্যালয়ে এই মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা ডিভিশনাল প্রেসক্লাবের সভাপতি মোঃ মতিউর রহমানের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহ আলম খানের বিশেষ উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি এক শোকাতুর ও হৃদয়বিদারক পরিবেশে রূপ নেয়।

“পৃথিবীর সবকিছু হারিয়েও মানুষ ঘুরে দাঁড়ায়, কিন্তু মায়ের শূন্যতা পূরণ হয় না”

শোকসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো শোকাচ্ছন্ন সন্তান শেখ শহিদুর রহমান পাভেল। তাঁর প্রতিটি কথা উপস্থিত প্রত্যেকের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস হয়ে বের হচ্ছিল। রুদ্ধকণ্ঠে, চোখভরা জল নিয়ে তিনি বলেন-

“আজকের এই মুহূর্তটি আমার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক, সবচেয়ে অন্ধকার সময়। মা এমন একজন মানুষ, যার ভালোবাসার কোনো বিকল্প এই নশ্বর পৃথিবীতে নেই। মায়ের দোয়াই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ, আমার পথচলার শক্তি। আজ আমি নিঃস্ব। পৃথিবীর সবকিছু হারিয়েও মানুষ হয়তো আবার কোনোমতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু মায়ের শূন্যতা… এই শূন্যতা কখনো, কোনো কিছু দিয়ে পূরণ হয় না। সেই চিরন্তন শূন্যতা এখন সারাজীবন বুকের ভেতর এক নীরব, অবিরাম কান্না হয়ে আমাকে বয়ে বেড়াতে হবে।”

তিনি অশ্রুভেজা চোখে উপস্থিত সবার দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “আমার প্রিয় মায়ের জন্য আজ আপনারা যারা নিজের খেয়ে, সময় বের করে এখানে এসেছেন, আপনাদের এই সহমর্মিতা আমাদের এই ভাঙা বুককে কিছুটা সান্ত্বনা দেয়। আমি মহান আল্লাহ তাআলার কাছে আকুল প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমার মায়ের সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন।”

তিনি উপস্থিত সবার কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ করেন, যেন সবাই তাঁর মায়ের রুহের মাগফিরাতের জন্য প্রাণখুলে দোয়া করেন।

পাভেলের এই মর্মস্পর্শী ও আবেগঘন বক্তব্য যখন হলরুমে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, তখন উপস্থিত অতিথি ও সাংবাদিকদের অনেকেই আর চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। লতিফা রহমানের মতো একজন ধর্মপ্রাণ ও সমাজ হিতৈষী মায়ের চলে যাওয়া যে কত বড় ক্ষতি, তা বক্তাদের কথায় ফুটে ওঠে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন উপকূল মানবাধিকার সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মোঃ সিদ্দিকুর রহমান সিদ্দীকসহ বিভিন্ন সামাজিক, মানবাধিকার, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক সমাজ এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। প্রত্যেকেই মরহুমার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, জীবনের দীর্ঘ সময় লতিফা রহমান কেবল নিজের পরিবারকেই আগলে রাখেননি, বরং সন্তানদের মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধে বলীয়ান করে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি দুই ছেলে, এক মেয়ে এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন, যাদের হৃদয়ে তিনি আজীবন বেঁচে থাকবেন এক টুকরো পরম আলো হয়ে।

অনুষ্ঠানের শেষলগ্নে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যখন মরহুমার রুহের মাগফিরাত ও বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করা হয়।

হাতজোড় করে যখন আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করা হচ্ছিল, তখন পুরো সভাকক্ষে কেবল কান্নার ফুঁপিয়ে ওঠা শব্দ শোনা যাচ্ছিল। উপস্থিত সকলেই হাত তুলে মহান রবের কাছে মিনতি করেন, যেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন লতিফা রহমানকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ স্থান দান করেন এবং এই শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই অপূরণীয় ক্ষতি ও বুকফাটা কষ্ট সহ্য করার তৌফিক দান করেন। আমিন।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।