সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার এক সাধারণ রাজমিস্ত্রির জীবন থেমে গেল হাজারো স্বপ্নের মাঝপথে। পরিবারের অভাব ঘোচাতে ও ভালো জীবনের আশায় বিপদসংকুল পথে ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছিলেন মুহিবুর রহমান। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে উঠল তার জীবনের শেষ অধ্যায়। ভূমধ্যসাগরের উত্তাল জলরাশিতে অনাহার ও তৃষ্ণায় তার করুণ মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সহযাত্রী এক যুবক।
মুহিবুর রহমান উপজেলার ভাতগাঁও ইউনিয়নের গাগলাজুর গ্রামের বাসিন্দা নুরুল আমিনের জ্যেষ্ঠ ছেলে। তিন ভাই ও দুই বোনের সংসারে বড় সন্তান হিসেবে পরিবারের দায়িত্ব অনেকটাই তার কাঁধেই ছিল। রাজমিস্ত্রির কাজ করে যা আয় করতেন, তা দিয়েই চলত পুরো পরিবার।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, উন্নত জীবনের আশায় দালালচক্রের প্রলোভনে পড়ে প্রায় ১৩ লাখ টাকার বিনিময়ে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মুহিবুর। স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে লিবিয়া হয়ে অবৈধভাবে গ্রিসে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা হয়। তার সঙ্গে একই এলাকার আরও কয়েকজন তরুণও এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় শামিল হন।
গত শনিবার ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের ১২ জনের মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছানোর পর থেকেই মুহিবুরের পরিবার উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছিল। দালালের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাননি তারা। অবশেষে সোমবার গ্রিসে অবস্থানরত একই নৌকার যাত্রী মারুফ আহমদ পরিবারের কাছে ফোনে মুহিবুরের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন।
মারুফের বর্ণনায় উঠে আসে বিভীষিকাময় সেই যাত্রার চিত্র। তার ভাষ্যমতে, দীর্ঘদিন খাবার ও পানির সংকটে পড়ে নৌকায় থাকা যাত্রীরা একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সবার আগে মৃত্যুবরণ করেন মুহিবুর। এরপর আরও কয়েকজন প্রাণ হারান। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, মরদেহগুলো পচে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে জীবিতরা সেগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন।
এই খবর পৌঁছানোর পর মুহিবুরের বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মা মহিমা বেগম বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন, শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ছোট ভাই হাফিজুর রহমান। বাবা নুরুল আমিন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন ছেলের মৃত্যুতে। পুরো পরিবার যেন দিশেহারা।
এ ঘটনায় এলাকায় শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা মানবপাচারকারী দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। সচেতন মহল বলছে, অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশ যাত্রা বন্ধে কঠোর নজরদারি জরুরি।
এ বিষয়ে ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ডিপ্লোমেসি চাকমা জানান, ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন এবং বিস্তারিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।
স্বপ্নপূরণের আশায় শুরু হওয়া এক যাত্রা যে এমন নির্মম পরিণতিতে শেষ হবে-তা হয়তো কল্পনাও করেননি মুহিবুর। তার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্যই এক সতর্কবার্তা হয়ে রইল।
দৈনিক টার্গেট 























