বাংলাদেশের সাফারি পার্কে বিভিন্ন সময় ইদানীং পশুপাখি মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। গাজীপুর সাফারি পার্কে এই ঘটনা বেশি ঘটছে। সম্প্রতি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ ও অন্যান্য কারণে এখানে কয়েকটি হাতি মারা গেছে। এর আগে এখানে ১১টি জেব্রা মারা গেছে। এ ছাড়া এখানে বাঘ ও সিংহীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে এক দিনের ব্যবধানে দুটি হাতির মৃত্যু হয়। পার্ক কর্তৃপক্ষের ধারণা অনুযায়ী অন্য হাতির সঙ্গে মারামারিতে রাজু বাহাদুর নামের হাতিটি গুরুতর আহত হয়েছিল। তার পা মারাত্মক জখম হয়। রাজু বাহাদুরকে বাঁচাতে থাইল্যান্ড থেকে বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ আনা হয়েছিল। স্থানীয় পশু চিকিৎসকের সঙ্গে মেডিকেল টিম গঠন করে চিকিৎসা করার পরও তাকে বাঁচানো যায়নি। প্রাথমিক প্রতিবেদনে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের কথা জানা গেছে।
শ্রীপুরে অবস্থিত এই সাফারি পার্কে ২০২১ সালে ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালে জানুয়ারি মাসের মধ্যে মোট ১১টি জেব্রা মারা যায়। কর্তৃপক্ষ ও বিশেষজ্ঞ দলের তদন্ত অনুযায়ী, দলের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মারামারিতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে চারটি জেব্রা মারা যায়। পরে বিন্নি ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে বাকি পাঁচ থেকে সাতটি জেব্রা মারা যায়। সে সময় মৃত্যুর ঘটনা গোপন ও দায়িত্বে অবহেলার কারণে পার্কের প্রকল্প পরিচালক, ভেটেরিনারি অফিসার, পার্কের ইনচার্জসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
জেব্রার মৃত্যুর পর পার্কে একটি বাঘ মারা যায়। ২০২২ সালে ৩ ফেব্রুয়ারি মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ ও শ্বাসকষ্টজনিত কারণে একটি সিংহী মারা যায়।
ঢাকা জেলার উত্তর পাশে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর ভাওয়ালের শালবনে অবস্থিত এই সাফারি পার্ক। এটিই বাংলাদেশের প্রথম ও সর্ববৃহৎ পূর্ণাঙ্গ সাফারি পার্ক। ২০১৩ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। একে পাঁচটি প্রধান অংশে বিভক্ত করা হয়েছে। একটি হলো সাফারি পার্কের কোর এরিয়া। এখানে বাঘ, সিংহ, হাতি, জেব্রা ঘুরে বেড়ায়।
ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক বলেও কক্সবাজার চকরিয়ায় একটি পার্ক রয়েছে। এটি আগে হরিণ প্রজনন কেন্দ্র ছিল। এটিকে আধুনিক ও উন্নত করার কাজ চলছে। এই পার্কেও কিছু পশুপাখির মৃত্যু হয়েছে। যেমন, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পার্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিংহ ‘সোহেল’ বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যায়। ২০২৩ সালে অ্যানাপ্লাজমা, বেবিসিয়া ইনফেকশনসহ বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যায় আরেকটি সিংহ। টেকনাফের পাহাড়ি এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া চার মাস বয়সী হাতিশাবক ভাইরাল সংক্রমণে মারা যায়। মায়ের দুধ না পাওয়ায় ইমিউনিটির অভাবে শাবকটি মারা যায়। এ ছাড়া পঞ্চগড় থেকে উদ্ধার করা একটি প্রাপ্ত বয়স্ক নীল গাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
তবে গাজীপুর সাফারি পার্কের মৃত্যুর ঘটনাটি বেশ বড়। আসলে সাফারি পার্কগুলোতে কেন পশুপাখির মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটে? প্রধানত যে কারণগুলো দেখা যায়, সেগুলো হলো তত্ত্বাবধান ও পরিচালনার অভাব। পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত অবহেলা ও তদারকির অভাবে এমনটা ঘটে। অনেক সময় সময়মতো রোগ নির্ণয় না হওয়ার কারণে পশুপাখি মারা যায়। উন্নত চিকিৎসার অভাবের বিষয়টিও রয়েছে। পশুপাখির জন্য পুষ্টিসম্মত ও মানসম্মত খাবার সরবরাহের অনিয়ম বা ঘাটতির কারণে অপুষ্টিতে পশুপাখির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। সঠিক কোয়ারেন্টিন না থাকার কারণে অনেক সময় রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে ব্যাকটেরিয়া-ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার কারণে মারা যেতে পারে। বন্দিদশায় কৃত্রিম পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে অনেক সময় পশুপাখি মারা যায়। অভিজ্ঞ ভেটেরিনারি সার্জন ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবও এই সমস্ত পশুমৃত্যুর কারণ বটে।
এই অবস্থায় সরকারের এই দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এ ছাড়া নিয়মিত প্রশাসনিক জবাবদিহি, নিয়মিত পশুপাখির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

দৈনিক টার্গেট 


























