০৮:১৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পোশাক খাতে শ্রমিক অসন্তোষ: সরকারের দায়িত্ব সমন্বয়ের পথ বের করা

  • দৈনিক টার্গেট
  • প্রকাশ: ০৮:০২:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
  • ৫ বার পঠিত হয়েছে

সরকারের ঘোষণার পরও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছিলেন। এর আগে রাজধানীর মিরপুর ও অদূরের গাজীপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভে শতাধিক কারখানায় ভাঙচুর হয়েছে। পুলিশের একাধিক গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। সহিংসতার মধ্যে একজন শ্রমিক নিহত হওয়ারও খবর পাওয়া গেছে।

এর বাইরে আরও বড় ক্ষতি আছে। শ্রমিকদের আন্দোলনের ফলে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার। শুধু গাজীপুর এলাকাতেই আন্দোলনে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা। আন্দোলনের তীব্রতায় ঢাকা, গাজীপুর, আশুলিয়া ও সাভারের ৬৯০টির বেশি পোশাক কারখানাকে সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। একযোগে প্রায় ১০ লাখের মতো শ্রমিক কাজ থেকে বিরত থেকেছেন। আবার যথাসময়ে পণ্যের শিপমেন্ট করতে না পারায় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাত (সুতা, ডাইং, প্যাকেজিং, পরিবহন ও বন্দর) স্থবির হয়ে পড়েছে। পণ্য সরবরাহের নির্ধারিত সময়সীমা রক্ষা করতে অনেক মালিককে চড়া মূল্যে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে। দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে বিদেশি ক্রেতাদের মূল কার্যাদেশ আসে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে। বলা হয়, মোট আদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ এই সময়ে আসে। তাহলে এত বড় ক্ষতির দায় এখন কে নেবে?

এ কথা মানতে হবে যে, অর্থনীতির অতি গুরুত্বপূর্ণ খাতের অংশীদার তৈরি পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি অন্যায্য কিছু নয়। কয়েক বছর ধরে দ্রব্যমূল্যের লাগামছাড়া ঊর্ধ্বগতির মধ্যে খাবারসহ নিত্যপণ্য কেনা এবং বাড়িভাড়াসহ সংসারের অন্যান্য শত ব্যয়ের চাপে শ্রমিকদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠছে। এখন মাস শেষে যে মজুরি তাঁরা পাচ্ছেন, তা দিয়ে পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করা অনেকের জন্যই দুরূহ। ফলে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে তাঁদের রাজপথে নামার বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই দাবিকে কেন্দ্র করে যে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও কারখানা বন্ধের ঘটনা ঘটছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

শ্রমিকদের জীবনের এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যাঁদের ঘামের বিনিময়ে দেশের পোশাকশিল্পের এই সাফল্য, তাঁদের জীবনমান উন্নয়নের দায়িত্ব শিল্পের মালিক, সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সবার। শ্রমিকদের পরিশ্রম ও দক্ষতার ওপরই দেশের বড় রপ্তানি আয়ের ভিত গড়ে উঠেছে। সেই শ্রমিকদের একটি বড় অংশ যদি জীবনযাত্রার ন্যূনতম মানের নিশ্চয়তা না পান, তাহলে শিল্পের এই সাফল্য টেকসই হবে না।

অন্যদিকে পোশাকশিল্প পরিস্থিতির সাম্প্রতিক বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না। এই খাত দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান এর সঙ্গে যুক্ত। এর বাইরে পরিবহন, আবাসন, ব্যাংকিং, বন্দর, কাঁচামাল সরবরাহ, খাবারের দোকানসহ অসংখ্য সহযোগী খাতও পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পোশাকশিল্পে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু কারখানার মালিকদের ওপর পড়বে না; শ্রমিক, তাঁদের পরিবার, সর্বোপরি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

গত কয়েক দিনের আন্দোলনে কয়েক শ কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। কোথাও কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে, কোথাও সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং যানবাহনে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। মহাসড়কে যাত্রীরা যানজটে আটকা পড়ে দুর্ভোগ সয়েছেন। এসব কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি আদায়ের পথ হতে পারে না। কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে উৎপাদন বন্ধ থাকলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাবে না। এতে শেষ পর্যন্ত দরিদ্র শ্রমিকেরাই বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন। ক্রেতাদের অর্ডার অন্য দেশে চলে গেলে কিংবা ক্রেতারা স্থায়ীভাবে বাংলাদেশের ওপর আস্থা হারালে কর্মসংস্থানের ওপর তার প্রভাব পড়বে। তাই আন্দোলনের নামে সহিংসতা ও সম্পদ ধ্বংসের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। শ্রমিকনেতাদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে।

সরকার বলেছে, পোশাককর্মীদের এই আন্দোলনের সঙ্গে কিছু ব্যবসায়ী ও সাবেক সরকারের মন্ত্রী-এমপির হাত আছে। সরকার অবশ্য তাঁদের কারও নাম উল্লেখ করেনি। আমাদের দেশের যে বাস্তবতা তাতে আন্দোলনে সুযোগসন্ধানীদের উসকানি দেওয়ার দাবি বা সন্দেহ এক কথায় খারিজ করা যায় না। তবে একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, শ্রমিকদের সব অসন্তোষকেই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বা বাইরের উসকানি হিসেবে দেখার প্রবণতা কাম্য নয়। এতে সমস্যার সমাধানও মিলবে না। আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাত রয়েছে—এমন বিশ্বাসযোগ্য আলামত দেখলে তা অবশ্যই তদন্ত করে দেখতে হবে। কিন্তু শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, কম মজুরি, চাকরির অনিশ্চয়তা ইত্যাদি পুঞ্জীভূত সমস্যা আড়াল করার জন্য ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আশ্রয় নেওয়া মোটেই ঠিক হবে না। প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করে সাধ্যমতো তার সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না করে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে শক্তিপ্রয়োগ করলে রাস্তাঘাট সাময়িকভাবে শান্ত হতে পারে, কিন্তু কর্মীর অসন্তোষ কোনো দিনই দূর হবে না।

এখানে পোশাকশিল্পের মালিকপক্ষের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎসংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ এবং দামের প্রতিযোগিতা, ক্রয়াদেশের অনিশ্চয়তা—এসব বাস্তব সমস্যা তাদের মোকাবিলা করতে হয়। কিন্তু এসব চ্যালেঞ্জের বোঝা শ্রমিকদের ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে চাপিয়ে দেওয়া সংগত হবে না। শিল্পের সক্ষমতা ও মুনাফার হিসাবের পাশাপাশি শ্রমিকদের একটা মাত্রায় গ্রহণযোগ্য জীবনমান নিশ্চিত করার বিষয়টিও মালিকদের বিবেচনায় নিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা, নিয়মিত বেতন, অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক এবং আইন অনুযায়ী অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব বিষয়ের গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে শুধু কিছু মজুরি বাড়িয়ে শ্রমিক অসন্তোষ টেকসইভাবে দূর করা যাবে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দায়িত্ব। এর ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ তুলনায় কম। তবে একেবারে নেই তা নয়। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের পণ্য যাঁরা নিয়মিত কিনছেন, তাঁদেরও শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে হবে। কম দামে পণ্য কেনার প্রতিযোগিতায় উৎপাদনকারীদের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করা হলে তার নেতিবাচক প্রভাব শ্রমিকদের ওপর বড়ভাবেই পড়ে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে চললেও ক্রেতারা যদি ন্যায্য মূল্য দিতে আগ্রহী না হন, অন্যায় সুযোগ নেন, তাহলে শুধু স্থানীয় মালিকদের পক্ষে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের পুরো ব্যয় বহন করা কঠিন হবে। তাই ন্যায্য মজুরির প্রশ্নে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার শিল্পমালিকদের কৌশল ঠিক করতে হবে।

নতুন মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু একটি অঙ্ক নির্ধারণ করলেই হবে না, শ্রমিকদের পরিবারসহ সার্বিক জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, মূল্যস্ফীতির হার বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পের সক্ষমতার বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রয়োজনে মজুরি বৃদ্ধির বাস্তবায়ন পর্যায়ক্রমে করা যেতে পারে। তবে পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়নের নামে সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্দিষ্ট বিরতিতে তা পর্যালোচনার ব্যবস্থাও রাখতে হবে।

সরকারের দায়িত্ব এখানে সবচেয়ে বেশি। একদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে, অন্যদিকে মালিকদের শিল্পের পরিবেশ স্থিতিশীল রাখাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, বন্দর ও পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে শ্রম আইন বাস্তবায়ন, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের দাবি জানানোর জন্য যাতে বারবার রাজপথে নামতে না হয়।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্প রেমিট্যান্স বাদ দিলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান ভিত্তি। রপ্তানি খাতের প্রাণভোমরা। এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শ্রমিক, মালিক ও সরকারের পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থার ওপর। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি না দিয়ে শিল্পের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আবার শিল্পকে সংকটে ফেলে শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থও রক্ষা করা যাবে না। তাই জয়-পরাজয়ের হিসাব না করে এমন একটি সমাধান খুঁজতে হবে, যেখানে শ্রমিক সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ পাবেন, মালিকেরা শিল্প পরিচালনার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন এবং বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে।

শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তাঁর অধিকার। আর শিল্পের স্থিতিশীলতা শুধু মালিকের স্বার্থ নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির বিষয়। এই দুইয়ের মধ্যে বিরোধ তৈরি না করে সমন্বয়ের পথ বের করাই এখন সরকারের প্রধান দায়িত্ব। সেটা না করে অন্য পথ ধরলে সংকট বাড়বে, সমাধান আর হবে না।

এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি, দিশেহারা ভোক্তা

এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি, দিশেহারা ভোক্তা

বেঁচে থাকার জন্য শরীরে খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা যেমন অত্যাবশ্যক, তেমনি সেই খাদ্য প্রস্তুতের জন্য প্রয়োজন রান্নার জ্বালানি। রান্নায় ব্যবহৃত এলপিজি গ্যাস এখন মানুষের প্রতিদিনের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ সেই আগুন জ্বালানোর জ্বালানিই এখন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বাড়তি…

নিরাপত্তার সমাধান, নাকি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ফাঁদ

নিরাপত্তার সমাধান, নাকি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ফাঁদ

শহরের রাস্তায় ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। যানজট, অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, দুর্ঘটনা ও সড়কের সীমিত জায়গা—সবই বাস্তব সমস্যা। কিন্তু কোনো সমস্যা বাস্তব হলেই তার সমাধান হিসেবে যেকোনো বিধিনিষেধ ন্যায্য হয়ে যায় না। বিধিনিষেধের লক্ষ্য হওয়া উচিত নিরাপত্তা, সুশৃঙ্খল চলাচল ও যাত্রীর অধিকার নিশ্চিত করা।

জনপ্রিয় টার্গেট

পোশাক খাতে শ্রমিক অসন্তোষ: সরকারের দায়িত্ব সমন্বয়ের পথ বের করা

প্রকাশ: ০৮:০২:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

সরকারের ঘোষণার পরও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছিলেন। এর আগে রাজধানীর মিরপুর ও অদূরের গাজীপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভে শতাধিক কারখানায় ভাঙচুর হয়েছে। পুলিশের একাধিক গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। সহিংসতার মধ্যে একজন শ্রমিক নিহত হওয়ারও খবর পাওয়া গেছে।

এর বাইরে আরও বড় ক্ষতি আছে। শ্রমিকদের আন্দোলনের ফলে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার। শুধু গাজীপুর এলাকাতেই আন্দোলনে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা। আন্দোলনের তীব্রতায় ঢাকা, গাজীপুর, আশুলিয়া ও সাভারের ৬৯০টির বেশি পোশাক কারখানাকে সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। একযোগে প্রায় ১০ লাখের মতো শ্রমিক কাজ থেকে বিরত থেকেছেন। আবার যথাসময়ে পণ্যের শিপমেন্ট করতে না পারায় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাত (সুতা, ডাইং, প্যাকেজিং, পরিবহন ও বন্দর) স্থবির হয়ে পড়েছে। পণ্য সরবরাহের নির্ধারিত সময়সীমা রক্ষা করতে অনেক মালিককে চড়া মূল্যে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে। দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে বিদেশি ক্রেতাদের মূল কার্যাদেশ আসে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে। বলা হয়, মোট আদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ এই সময়ে আসে। তাহলে এত বড় ক্ষতির দায় এখন কে নেবে?

এ কথা মানতে হবে যে, অর্থনীতির অতি গুরুত্বপূর্ণ খাতের অংশীদার তৈরি পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি অন্যায্য কিছু নয়। কয়েক বছর ধরে দ্রব্যমূল্যের লাগামছাড়া ঊর্ধ্বগতির মধ্যে খাবারসহ নিত্যপণ্য কেনা এবং বাড়িভাড়াসহ সংসারের অন্যান্য শত ব্যয়ের চাপে শ্রমিকদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠছে। এখন মাস শেষে যে মজুরি তাঁরা পাচ্ছেন, তা দিয়ে পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করা অনেকের জন্যই দুরূহ। ফলে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে তাঁদের রাজপথে নামার বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই দাবিকে কেন্দ্র করে যে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও কারখানা বন্ধের ঘটনা ঘটছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

শ্রমিকদের জীবনের এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যাঁদের ঘামের বিনিময়ে দেশের পোশাকশিল্পের এই সাফল্য, তাঁদের জীবনমান উন্নয়নের দায়িত্ব শিল্পের মালিক, সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সবার। শ্রমিকদের পরিশ্রম ও দক্ষতার ওপরই দেশের বড় রপ্তানি আয়ের ভিত গড়ে উঠেছে। সেই শ্রমিকদের একটি বড় অংশ যদি জীবনযাত্রার ন্যূনতম মানের নিশ্চয়তা না পান, তাহলে শিল্পের এই সাফল্য টেকসই হবে না।

অন্যদিকে পোশাকশিল্প পরিস্থিতির সাম্প্রতিক বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না। এই খাত দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান এর সঙ্গে যুক্ত। এর বাইরে পরিবহন, আবাসন, ব্যাংকিং, বন্দর, কাঁচামাল সরবরাহ, খাবারের দোকানসহ অসংখ্য সহযোগী খাতও পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পোশাকশিল্পে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু কারখানার মালিকদের ওপর পড়বে না; শ্রমিক, তাঁদের পরিবার, সর্বোপরি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

গত কয়েক দিনের আন্দোলনে কয়েক শ কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। কোথাও কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে, কোথাও সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং যানবাহনে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। মহাসড়কে যাত্রীরা যানজটে আটকা পড়ে দুর্ভোগ সয়েছেন। এসব কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি আদায়ের পথ হতে পারে না। কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে উৎপাদন বন্ধ থাকলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাবে না। এতে শেষ পর্যন্ত দরিদ্র শ্রমিকেরাই বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন। ক্রেতাদের অর্ডার অন্য দেশে চলে গেলে কিংবা ক্রেতারা স্থায়ীভাবে বাংলাদেশের ওপর আস্থা হারালে কর্মসংস্থানের ওপর তার প্রভাব পড়বে। তাই আন্দোলনের নামে সহিংসতা ও সম্পদ ধ্বংসের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে। শ্রমিকনেতাদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে।

সরকার বলেছে, পোশাককর্মীদের এই আন্দোলনের সঙ্গে কিছু ব্যবসায়ী ও সাবেক সরকারের মন্ত্রী-এমপির হাত আছে। সরকার অবশ্য তাঁদের কারও নাম উল্লেখ করেনি। আমাদের দেশের যে বাস্তবতা তাতে আন্দোলনে সুযোগসন্ধানীদের উসকানি দেওয়ার দাবি বা সন্দেহ এক কথায় খারিজ করা যায় না। তবে একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, শ্রমিকদের সব অসন্তোষকেই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বা বাইরের উসকানি হিসেবে দেখার প্রবণতা কাম্য নয়। এতে সমস্যার সমাধানও মিলবে না। আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাত রয়েছে—এমন বিশ্বাসযোগ্য আলামত দেখলে তা অবশ্যই তদন্ত করে দেখতে হবে। কিন্তু শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, কম মজুরি, চাকরির অনিশ্চয়তা ইত্যাদি পুঞ্জীভূত সমস্যা আড়াল করার জন্য ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আশ্রয় নেওয়া মোটেই ঠিক হবে না। প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করে সাধ্যমতো তার সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না করে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে শক্তিপ্রয়োগ করলে রাস্তাঘাট সাময়িকভাবে শান্ত হতে পারে, কিন্তু কর্মীর অসন্তোষ কোনো দিনই দূর হবে না।

এখানে পোশাকশিল্পের মালিকপক্ষের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎসংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ এবং দামের প্রতিযোগিতা, ক্রয়াদেশের অনিশ্চয়তা—এসব বাস্তব সমস্যা তাদের মোকাবিলা করতে হয়। কিন্তু এসব চ্যালেঞ্জের বোঝা শ্রমিকদের ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে চাপিয়ে দেওয়া সংগত হবে না। শিল্পের সক্ষমতা ও মুনাফার হিসাবের পাশাপাশি শ্রমিকদের একটা মাত্রায় গ্রহণযোগ্য জীবনমান নিশ্চিত করার বিষয়টিও মালিকদের বিবেচনায় নিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা, নিয়মিত বেতন, অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক এবং আইন অনুযায়ী অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব বিষয়ের গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে শুধু কিছু মজুরি বাড়িয়ে শ্রমিক অসন্তোষ টেকসইভাবে দূর করা যাবে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দায়িত্ব। এর ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ তুলনায় কম। তবে একেবারে নেই তা নয়। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের পণ্য যাঁরা নিয়মিত কিনছেন, তাঁদেরও শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে হবে। কম দামে পণ্য কেনার প্রতিযোগিতায় উৎপাদনকারীদের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করা হলে তার নেতিবাচক প্রভাব শ্রমিকদের ওপর বড়ভাবেই পড়ে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে চললেও ক্রেতারা যদি ন্যায্য মূল্য দিতে আগ্রহী না হন, অন্যায় সুযোগ নেন, তাহলে শুধু স্থানীয় মালিকদের পক্ষে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের পুরো ব্যয় বহন করা কঠিন হবে। তাই ন্যায্য মজুরির প্রশ্নে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার শিল্পমালিকদের কৌশল ঠিক করতে হবে।

নতুন মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু একটি অঙ্ক নির্ধারণ করলেই হবে না, শ্রমিকদের পরিবারসহ সার্বিক জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, মূল্যস্ফীতির হার বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পের সক্ষমতার বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রয়োজনে মজুরি বৃদ্ধির বাস্তবায়ন পর্যায়ক্রমে করা যেতে পারে। তবে পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়নের নামে সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্দিষ্ট বিরতিতে তা পর্যালোচনার ব্যবস্থাও রাখতে হবে।

সরকারের দায়িত্ব এখানে সবচেয়ে বেশি। একদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে, অন্যদিকে মালিকদের শিল্পের পরিবেশ স্থিতিশীল রাখাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে। শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, বন্দর ও পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে শ্রম আইন বাস্তবায়ন, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের দাবি জানানোর জন্য যাতে বারবার রাজপথে নামতে না হয়।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্প রেমিট্যান্স বাদ দিলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান ভিত্তি। রপ্তানি খাতের প্রাণভোমরা। এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শ্রমিক, মালিক ও সরকারের পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থার ওপর। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি না দিয়ে শিল্পের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আবার শিল্পকে সংকটে ফেলে শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থও রক্ষা করা যাবে না। তাই জয়-পরাজয়ের হিসাব না করে এমন একটি সমাধান খুঁজতে হবে, যেখানে শ্রমিক সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ পাবেন, মালিকেরা শিল্প পরিচালনার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন এবং বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে।

শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তাঁর অধিকার। আর শিল্পের স্থিতিশীলতা শুধু মালিকের স্বার্থ নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির বিষয়। এই দুইয়ের মধ্যে বিরোধ তৈরি না করে সমন্বয়ের পথ বের করাই এখন সরকারের প্রধান দায়িত্ব। সেটা না করে অন্য পথ ধরলে সংকট বাড়বে, সমাধান আর হবে না।

এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি, দিশেহারা ভোক্তা

এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি, দিশেহারা ভোক্তা

বেঁচে থাকার জন্য শরীরে খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা যেমন অত্যাবশ্যক, তেমনি সেই খাদ্য প্রস্তুতের জন্য প্রয়োজন রান্নার জ্বালানি। রান্নায় ব্যবহৃত এলপিজি গ্যাস এখন মানুষের প্রতিদিনের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ সেই আগুন জ্বালানোর জ্বালানিই এখন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বাড়তি…

নিরাপত্তার সমাধান, নাকি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ফাঁদ

নিরাপত্তার সমাধান, নাকি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ফাঁদ

শহরের রাস্তায় ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। যানজট, অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, দুর্ঘটনা ও সড়কের সীমিত জায়গা—সবই বাস্তব সমস্যা। কিন্তু কোনো সমস্যা বাস্তব হলেই তার সমাধান হিসেবে যেকোনো বিধিনিষেধ ন্যায্য হয়ে যায় না। বিধিনিষেধের লক্ষ্য হওয়া উচিত নিরাপত্তা, সুশৃঙ্খল চলাচল ও যাত্রীর অধিকার নিশ্চিত করা।