জুলফিকার আলী ভুট্টো পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের মন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু দেশভাগের সময় তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে ছিলেন। সেই সুযোগে ভারত সরকার বোম্বেতে তাঁর সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে এবং সেগুলোকে ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি’ হিসেবে ঘোষণা দেয়। যুক্তি ছিল, সম্পত্তির মালিক পাকিস্তানে চলে গেছেন, ফলে সম্পত্তিগুলো পরিত্যক্ত বলে বিবেচিত হবে।
স্ট্যানলি ওলপার্ট তাঁর ‘Zulfi Bhutto of Pakistan: His Life and Times’ গ্রন্থে লিখেছেন, বাবা-মা জুনাগড়ে চলে যাওয়ার পর জুলফিকার বোম্বের কারমাইকেল রোডে অবস্থিত তাঁদের বাড়ি ‘দ্য নেস্ট’-এ বসবাস করতেন। আইনজীবী সঞ্জয় ঘোষ ‘বার অ্যান্ড বেঞ্চ’ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে জানান, বোম্বের ৪ এ, ওরলি এস্টেটে অবস্থিত বাড়িটি স্যার শাহনওয়াজ ভুট্টো বোম্বে মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের কাছ থেকে স্থায়ী ইজারায় নিয়েছিলেন। বাড়িটির জন্য তিনি ২৫ হাজার ৩৪৪ রুপি দিয়েছিলেন। এর বার্ষিক ভাড়া ছিল মাত্র এক রুপি।
ভুট্টো পরিবারের সম্পত্তি কেবল ওই বাড়িতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বোম্বের ব্যস্ত ফোর্ট এলাকায় তাঁদের বহুতল হোটেল অ্যাস্টোরিয়াও ছিল। সঞ্জয় ঘোষের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৪৬-৪৭ সালে ওই হোটেল থেকে স্যার শাহনওয়াজ প্রতি মাসে এক লাখ ১০ হাজার রুপির বেশি ভাড়া পেতেন। সে সময়ের হিসাবে এটি ছিল বিপুল অঙ্কের অর্থ। এ ছাড়া তিনি বেশ কয়েকটি আর্থিক জামানত, মূল্যবান সামগ্রী ও নগদ অর্থও রেখে গিয়েছিলেন।
সঞ্জয় ঘোষের মতে, স্যার শাহনওয়াজ এসব সম্পত্তি তাঁর ১৮ বছর বয়সি ছেলে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নামে হস্তান্তর করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে জুলফিকার উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। একই বছরের নভেম্বরে তাঁর বাবা স্যার শাহনওয়াজ ভুট্টো স্থায়ীভাবে করাচিতে বসবাস শুরু করেন।
বোম্বের সম্পত্তি নিয়ে বিতর্ক বোঝার জন্য ভুট্টোর পাকিস্তান-সম্পর্কিত রাজনৈতিক অবস্থানটিও গুরুত্বপূর্ণ। সঞ্জয় ঘোষ লিখেছেন, এর কয়েক বছর আগে, মাত্র ১৫ বছর বয়সে ক্যাথেড্রাল অ্যান্ড জন কনন স্কুলের ছাত্র থাকাকালে জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, ‘এমন এক সময় আসবে, যখন পাকিস্তানের জন্য আমি আমার জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করব।’
স্ট্যানলি ওলপার্টের বর্ণনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে জুলফিকার প্রায়ই বন্ধুদের কাছে জিন্নাহর কথা বলতেন। তিনি বলতেন, ‘তিনি আমার নেতা! তিনি আমার আদর্শ, তিনিই সেই ব্যক্তি, যাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি।’ ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে জিন্নাহর মৃত্যুর পর ভুট্টো ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রদূত এমএএইচ. ইস্পাহানিকে একটি চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘এই সংকটময় মুহূর্তে আমরা এতিম হয়ে পড়েছি, যখন আমাদের প্রিয় নেতার সীমাহীন উদারতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল।’
গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময় তিনি কিছুদিন ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবেও কাজ করেছিলেন।
এই তথ্যগুলো ভুট্টোর পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। পরবর্তী সময়ে ভারতে তাঁর নাগরিকত্বের দাবি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলেও তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আদর্শের প্রতি প্রকাশ্য আনুগত্যের ইতিহাস ছিল দীর্ঘ।
১৯৪৯ সালের ৬ জুলাই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ‘ইভ্যাকুই’ বা সম্পত্তি পরিত্যাগ করে চলে যাওয়া ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করে। এর ফলে তাঁর সম্পত্তিগুলো সরকারি হেফাজতে নেওয়া হয়। আইনজীবী ও লেখক এজি নুরানি ‘ফ্রন্টলাইন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, ভুট্টো পরবর্তী ৯ বছর ধরে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালান। তিনি কাস্টডিয়ানের কাছে, কাস্টডিয়ান জেনারেলের কাছে, বোম্বে ও পাঞ্জাব হাইকোর্টে এবং শেষ পর্যন্ত ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বিভিন্ন পর্যায়ে আবেদন ও আপিল করেন।
নুরানির বর্ণনা অনুযায়ী, ভুট্টোর আইনি অবস্থানে একটি স্পষ্ট দ্বৈততা ছিল। একদিকে তিনি দাবি করছিলেন, তিনি সম্পত্তি পরিত্যাগ করে ভারতে ছেড়ে যাননি। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, পাকিস্তানি নাগরিকত্ব কিংবা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের বিষয়টি অস্বীকার করছিলেন। অন্যদিকে, বোম্বে হাইকোর্টে জমা রাখা অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য তিনি পাকিস্তানেও আবেদন করেছিলেন। সেখানে তিনি নিজেকে সেই ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছিলেন, যিনি সম্পত্তি ছেড়ে চলে গেছেন।
এই দুই অবস্থানের মধ্যে আপাতবিরোধই পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।
১৯৬৫ সালের ১৯ নভেম্বর ভারতের সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় শরণার্থী পুনর্বাসনমন্ত্রী মহাবীর তিয়্যাগি ভুট্টোর নাগরিকত্বের বিষয়টি উত্থাপন করেন। নুরানি লিখেছেন, তিয়্যাগি বলেছিলেন, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো দেশভাগের সময় তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গে বোম্বেতে বসবাস করতেন এবং সেখানে তাঁর সম্পত্তি ছিল। রাজ্যসভার কার্যবিবরণীর সরকারি প্রতিবেদন এবং ত্যাগীর উপস্থাপিত আদালতের নথি অনুযায়ী, ভুট্টো ১৯৪৯ সালের ২৭ জুলাই সম্পত্তির ডেপুটি কাস্টডিয়ানের কাছে এবং ১৯৫১ সালের ১৭ নভেম্বর কাস্টডিয়ানের কাছে হলফনামা দিয়েছিলেন।
এসব হলফনামায় তিনি জানান, সিনিয়র কেমব্রিজ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আনুমানিক ১৯৪৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তিনি বোম্বে ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখানে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন বলেও দাবি করেন। বিদেশে যাওয়ার সময় তাঁর কাছে ভারতীয় পাসপোর্ট ছিল বলে তিনি আবেদনে উল্লেখ করেন। ১৯৪৯ সালের ২৭ জুলাইয়ের একটি হলফনামায় ভুট্টো লিখেছিলেন, ‘১৯৪৫ সাল থেকেই আমি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করতে শুরু করি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে আসা উত্তরগুলো আমার বাবা পেতেন। আমি বোম্বেতে পড়াশোনা করেছি। আমি করাচিতে বসবাস করছি না।’
১৯৫৬ সালের ৩০ জানুয়ারি ভারতের কাস্টডিয়ান জেনারেলের কাছে দাখিল করা আপিলেও তিনি একই ধরনের অবস্থান তুলে ধরেন। সেখানে নিজেকে করাচির অস্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, আবেদনকারী একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ছিলেন এবং নিজের কাজকর্মের জন্য আইনত দায়বদ্ধ ছিলেন। তাঁর বাবা-মা করাচিতে বসবাস করতেন এবং সেখানে তাঁর বিয়ে হয়েছিল, শুধু এ কারণে করাচিকে তাঁর স্থায়ী আবাস হিসেবে গণ্য করা যায় না।
এজি নুরানি আদালতের নথির উদ্ধৃতি দিয়ে আরও লিখেছেন, ভুট্টো তাঁর আপিলে বলেছিলেন, ‘মাননীয় কাস্টডিয়ান বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন যে—আবেদনকারী ভারতীয় নাগরিক হিসেবে ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট সময়েও ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর কোনো এক প্রাসঙ্গিক সময়ে আবেদনকারী করাচিকে নিজের স্থায়ী আবাস হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, এমন কোনো প্রমাণ নথিতে না থাকা সত্ত্বেও কাস্টডিয়ান এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে ভুল করেছেন।’
১৯৫৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ভুট্টো ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আরেকটি আপিল করেন। সেখানে তিনি আবেদন জানান, তাঁকে সম্পত্তি পরিত্যাগকারী হিসেবে গণ্য করে তাঁর বিরুদ্ধে পরিচালিত সব কার্যক্রম অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা হোক।
এজি নুরানির মতে, ১৯৫৭ সালেই ভুট্টো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের সদস্য হন। সাধারণ পরিষদের অধিবেশন প্রতিবছর সেপ্টেম্বরে শুরু হয়। ১৯৫৮ সালের এপ্রিলে তিনি জেনেভায় সমুদ্র আইনবিষয়ক সম্মেলনেও পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অংশ নেন। ১৯৫৮ সালের ১৩ আগস্ট ভুট্টো ভারতের সুপ্রিম কোর্টে তাঁর আপিল প্রত্যাহারের আবেদন করেন। আবেদনে তিনি জানান, এখন তিনি করাচিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন এবং আদালতে বিচারাধীন ১৯৫৭ সালের ৪৮৯ নম্বর আপিলটি আর চালিয়ে যেতে চান না।
১৯৫৮ সালের ৩ নভেম্বর আদালত তাঁকে আপিল প্রত্যাহারের অনুমতি দেয়।
ভারতে আইনি লড়াই চলার সময়ই পাকিস্তানে ভুট্টো তাঁর পরিবারের রেখে যাওয়া সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ পাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এজি নুরানির মতে, ১৯৫৬ সালে, অর্থাৎ ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আপিল প্রত্যাহারের প্রায় দুই বছর আগে, ভুট্টো রেজিস্ট্রেশন অব ক্লেইম অ্যাক্ট–১৯৫৫ বা ১৯৫৫ সালের দাবি নিবন্ধন আইনের অধীনে পাকিস্তানে ক্ষতিপূরণের আবেদন করেছিলেন।
নুরানির বর্ণনা অনুযায়ী, পাকিস্তানে দাখিল করা আবেদনে ভুট্টো বোম্বের অ্যাস্টোরিয়া হোটেলের মূল্য ১২ লাখ রুপি এবং বাড়িটির মূল্য ১৪ লাখ রুপি নির্ধারণ করেছিলেন। কিন্তু দাবি কর্মকর্তা হোটেলটির জন্য ৩৯ লাখ ৩০ হাজার রুপির ক্ষতিপূরণ দাবি অনুমোদন করেন। অন্য সম্পদের ক্ষেত্রে তিনি ঘোষণা করেন, ভুট্টো ১৪ লাখ রুপি মূল্যের সিকিউরিটিজ বা আর্থিক দলিল পাওয়ার অধিকারী।
ভুট্টো এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ডেপুটি ক্লেইমস কমিশনারের কাছে আপিল করেন। ১৯৫৬ সালের ৬ অক্টোবরের আদেশে কমিশনার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের উদ্দেশ্যে হোটেলটির মূল্য বাড়িয়ে ৯৯ লাখ ৭০ হাজার রুপি করেন। এরপর ভুট্টো দাবি কমিশনারের কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। সরকার অনুমোদিত সংশোধিত সূত্র অনুসারে কমিশনার সম্পত্তিটির মূলধনী মূল্য নির্ধারণ করেন ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৪০০ রুপি। এই সূত্রে ১৯৪৬ সালের মোট বার্ষিক ভাড়াকে ৪০ দিয়ে গুণ করে সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এজি নুরানি লিখেছেন, চূড়ান্ত আদেশটি জারি করা হয় ১৯৫৭ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর, অর্থাৎ ভুট্টো ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আপিল দাখিল করার ঠিক এক সপ্তাহ পর। এখানেই ভুট্টোর আইনি অবস্থানের আপাতবিরোধটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারতে তিনি একই সম্পত্তির ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে। একই সময়ে পাকিস্তানে ওই সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক হিসেবে।
১৯৬৭ সালে আইয়ুব খানের মন্ত্রিসভা থেকে ভুট্টো বেরিয়ে আসার পর তাঁর নাগরিকত্বের বিষয়টি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে তার আগেই আইয়ুব খান নিজের ডায়েরিতে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।
৩ মার্চের ডায়েরিতে আইয়ুব খান লিখেছিলেন, ‘আমি ভারতের কাছ থেকে কিছু নথি পেয়েছি, যেগুলো থেকে দেখা যায়, জনাব ভুট্টো ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত নিজেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে দাবি করে আসছিলেন এবং বলেছিলেন যে তিনি করাচিতে কেবল অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। আমি বিষয়টি আরও যাচাই করার নির্দেশ দিয়েছি। এই ঘটনা শুধু প্রমাণ করে, লোকটি কতটা নীতিহীন ও বিবেকহীন।’
১৯৬৭ সালের ৩০ জুনের ডায়েরিতে তিনি আবার লেখেন, ‘জাতীয় পরিষদে একটি কঠিন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। ১৯৫৮ সালে মন্ত্রী হওয়ার আগ পর্যন্ত ভুট্টো আদালতে নিজেকে করাচিতে বসবাসরত একজন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে দাবি করে আসছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল ভারতে তাঁর বাবা-মায়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তির জন্য ক্ষতিপূরণ আদায় করা। বাস্তবে, তিনি প্রায় দেড় লাখ রুপির বিনিময়ে নিজের বিবেক বিক্রি করছিলেন। আমরা সম্প্রতি বিষয়টি জানতে পেরেছি, যখন ভারতীয় সংসদে এ নিয়ে আলোচনা হয় এবং ভারতীয় সংবাদপত্রগুলোতে তা প্রকাশিত হয়।’
আইয়ুব খানের এই বক্তব্যে ভুট্টোর বিরুদ্ধে অভিযোগের রাজনৈতিক চরিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর নাগরিকত্বের অবস্থানকে কেবল একটি আইনি প্রশ্ন হিসেবে না দেখে পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য ও রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছিল।
পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালের ৩০ জুন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের প্রশ্নোত্তর পর্বে জেড. এ. ভুট্টোর নাগরিকত্বের অবস্থান নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারের এমপি হাবিব-উর-রহমান ভান্ডারি সংক্ষিপ্ত নোটিশে বিষয়টি উত্থাপন করেন। বিরোধী দলের সদস্যদের একের পর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন বলেন, প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র থেকে মনে হচ্ছে, ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ভুট্টো পাকিস্তানে নিজেকে পাকিস্তানি নাগরিক এবং ভারতে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে দাবি করে আসছিলেন।
বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য বারবার উচ্চস্বরে বলেন, এই পর্যায়ে বিষয়টি উত্থাপনের পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। ভান্ডারি পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় সচিবকে প্রশ্ন করেছিলেন, পাকিস্তান সরকারের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ভারতীয় নাগরিকত্ব সম্পর্কে একজন ভারতীয় মন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের বিষয়ে তিনি অবগত আছেন কি না।
পার্লামেন্ট সচিব আবদুল আওয়াল ভূইয়া প্রশ্নের উত্তরে ইতিবাচক জবাব দেন। তিনি পার্লামেন্টে লিখিত বিবৃতি পড়ে শোনান। তাতে বলা হয়, ১৯৬৫ সালের ১৯ নভেম্বর রাজ্যসভায় একটি দৃষ্টি আকর্ষণী প্রস্তাবের জবাবে তৎকালীন শরণার্থী পুনর্বাসনমন্ত্রী মহাবীর তিয়্যাগিবলেছিলেন, কাস্টডিয়ান কর্তৃক দখল করা সম্পত্তি ফেরত দেওয়ার বিষয়ে দাখিল করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভুট্টো দাবি করেছিলেন যে তিনি একজন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন এবং সব সময়ই ভারতীয় নাগরিক ছিলেন।
সালমান তাসির তাঁর ‘Bhutto, A Political Biography’ গ্রন্থে লিখেছেন, ১৯৬৫ সালে ভারতীয় শরণার্থী পুনর্বাসনমন্ত্রী ভুট্টোর নাগরিকত্ব নিয়ে অভিযোগ তোলার পর পাকিস্তানের তৎকালীন সরকার সেগুলো জোরালোভাবে অস্বীকার করেছিল। তাসিরের বর্ণনা অনুযায়ী, অভিযোগের সূত্রপাত হয়েছিল বোম্বেতে শাহনওয়াজ ভুট্টোর মালিকানাধীন একটি বাড়ি বিক্রির ঘটনাকে কেন্দ্র করে। বাড়িটি তাঁর ছেলে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নামে ছিল। ভুট্টো তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় বাড়ি বিক্রির অর্থ আদালতে জমা রাখা হয়েছিল।
ভারত বিভক্ত হওয়ার পর ভুট্টো যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। ১৯৪৯ সালের ৬ জুলাই আদালতের আদেশে তাঁকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি আইনের অধীনে পরিত্যক্ত সম্পত্তির মালিক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর অর্থ ছিল, তিনি পাকিস্তানের আদালতেই তাঁর অর্থ ফেরত পাওয়ার আবেদন করতে পারতেন। তাসির লিখেছেন, তৎকালীন অধিকাংশ মানুষের মতো ভুট্টোও একটি ‘ব্রিটিশ ভারতীয়’ পাসপোর্ট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। তাই তাঁর যুক্তি ছিল, পরিত্যক্ত সম্পত্তির মালিক হিসেবে তাঁকে ঘোষণা করার কোনো এখতিয়ার ভারতীয় আদালতের ছিল না।
কিন্তু অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য তাঁর কিছু অপরিণামদর্শী আইনি প্রচেষ্টার ফলে এমন কয়েকটি বক্তব্য তৈরি হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে বিব্রত করে। তাসির বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, ভুট্টো আদালতে বলেছিলেন ‘শুধু এই কারণে যে আবেদনকারীর বাবা-মা করাচিতে বসবাস করতেন এবং আবেদনকারীরও সেখানে বিয়ে হয়েছিল, এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে সংশ্লিষ্ট সময়ের কোনো এক পর্যায়ে আবেদনকারীর নিজের বাড়িও করাচিতে ছিল।’
তাসিরের মতে, একই সময়ে ভুট্টো পাকিস্তানেও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে জমা রাখা অর্থ ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সেখানে তিনি নিজেকে পাকিস্তানি নাগরিক হিসেবে উপস্থাপন করছিলেন। তবে তাসির ভুট্টোর আচরণকে পরিকল্পিত অসততা হিসেবে দেখেননি। তাঁর ভাষায়, ‘ভুট্টোর আচরণের মধ্যে রহস্যজনক বা অসৎ কিছু ছিল না। তিনি যখন অর্থ ফেরত পাওয়ার আবেদন করেছিলেন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। দেশভাগের পর সীমান্তের ওপারে ফেলে আসা সম্পত্তি নিয়ে পাকিস্তানি ও ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে এ ধরনের জটিল আইনি লড়াই ছিল খুবই সাধারণ ঘটনা। তবে এই মামলায় তাঁকে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হয়েছিল। আত্মপক্ষসমর্থনে তিনি বলেছিলেন, তিনি ও তাঁর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে সিন্ধুতে বসবাস করে আসছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সময় তাঁর কাছে ভারতীয় পাসপোর্ট থাকলেও ১৯৪৯ সালের জুলাই মাসে তিনি পাকিস্তানি পাসপোর্ট পেয়েছিলেন।’
এই ব্যাখ্যা ভুট্টোর পক্ষের যুক্তিটিকে সামনে আনে। তাঁর দাবি ছিল, সম্পত্তি ফেরত পাওয়ার আইনি লড়াইকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে দেশভাগ-পরবর্তী সম্পত্তি ও নাগরিকত্বের জটিলতার প্রেক্ষাপটে বিচার করা উচিত।
১৯৬৭ সালের ৩০ নভেম্বর জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) প্রতিষ্ঠা করেন। দলটি প্রতিষ্ঠার পর তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের সঙ্গে সংঘাত আরও তীব্র হয়। পিপিপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রফি রাজা তাঁর ‘Zulfiqar Ali Bhutto and Pakistan, 1967–1977’ গ্রন্থে লিখেছেন, আইয়ুব খানের তথ্যমন্ত্রী জাতীয় পরিষদে সেই অভিযোগ আবারও উত্থাপন করেন, যা ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর ভারতীয় সংসদেও আলোচিত হয়েছিল।
অভিযোগটি ছিল, ভুট্টো ভারতীয় নাগরিকত্বের ভিত্তিতে বোম্বের সম্পত্তির ওপর নিজের দাবি প্রত্যাহার করেছিলেন ১৯৫৮ সালের নভেম্বরে, ফেডারেল মন্ত্রী হওয়ার পর। রফি রাজা আরও জানান, ১৯৬৭ সালের ২ জুলাই দ্য ডন পত্রিকার একটি সম্পাদকীয়তেও অভিযোগগুলো পুনরাবৃত্তি করা হয়। সম্পাদকীয়টির শিরোনাম ছিল ‘Sad Revelations’, অর্থাৎ ‘দুঃখজনক উদ্ঘাটন’।
রফি রাজা লিখেছেন, ‘যেহেতু মন্ত্রীর অভিযোগগুলো সংসদীয় বিশেষাধিকারের কারণে আইনি সুরক্ষা পেয়েছিল, তাই আমরা অভিযোগগুলো অস্বীকার করে একটি বিস্তারিত জবাব দেওয়ার এবং মানহানির অভিযোগে ‘ডন’-কে আইনি নোটিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিই। বেশ কয়েকজন আইনজীবী এই মামলায় জড়াতে অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত আমি পত্রিকাটিকে একটি আইনি নোটিশ পাঠাই। তাতে অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়া এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়।’
আইনি নোটিশে বলা হয়েছিল, ‘জনাব জেড. এ. ভুট্টোর পাকিস্তান-ভারত সম্পর্কের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, পাকিস্তানি পাসপোর্ট গ্রহণ, ভারতে তাঁর মামলা এবং পাকিস্তানে সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ দাবি, এসবই নথিভুক্ত বিষয় এবং এখনো নথির অংশ হিসেবে বিদ্যমান।’
রফি রাজা জানান, শেষ পর্যন্ত তাঁরা আদালতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, তাতে দীর্ঘস্থায়ী মানহানির মামলায় জড়িয়ে পড়তে হতো। পরবর্তী সময়ে ভুট্টোকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে তাঁর পরিবারের অস্ত্রের মজুত রাখার লাইসেন্সগুলো বাতিল করা হয়। রফি রাজার মতে, এই পদক্ষেপের ফলেই ভুট্টোর বিরুদ্ধে তাঁর প্রথম রাজনৈতিক মামলা সৃষ্টি হয়।
১৯৬৭ সালের ৮ আগস্ট প্রকাশিত দ্য হিন্দু পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭ আগস্ট নয়াদিল্লিতে ভারতের সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় প্রশ্নোত্তর পর্বে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমসি ছাগলা জুলফিকার আলী ভুট্টোর মামলাটিকে ‘দ্বৈত আনুগত্যের’ ঘটনা বলে বর্ণনা করেন। হেম বড়ুয়ার প্রশ্নের জবাবে ছাগলা বলেন, তাঁর মনে হয় না ভুট্টো ভারতে ফিরে আসতে চাইবেন।
বিরোধী দলের আরও তিন সদস্য, নাথ পাই, সমর গুহ ও এম. এল. সোঁধি, জানতে চান, ভুট্টো যদি ভারতে ফিরে আসেন, তাহলে সরকার কি এই ‘অপব্যয়ী পুত্রকে’ ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে?
ছাগলা বলেন, ভুট্টোর ফিরে আসা একটি কাল্পনিক পরিস্থিতি। তবে তিনি ফিরে এলে ভারতের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী তাঁর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। ছাগলা আরও বলেন, ভুট্টোর সাম্প্রতিক বক্তৃতাগুলো থেকে বোঝা যায়, অতীতের মতোই তিনি ভারত সম্পর্কে ‘পরস্পরবিরোধী ও বিষাক্ত’ ভাষা ব্যবহার করছেন।
নাথ পাই জানতে চান, ভুট্টো যদি তাঁর নাগরিকত্ব পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে ভারত সরকার কি বোম্বেতে তাঁর সম্পত্তিগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে? ছাগলা সরাসরি জবাব দেন, “না, মহাশয়! ” এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকেও উত্তর চাওয়া হলে তিনিও নেতিবাচকভাবে মাথা নাড়েন।
স্ট্যানলি ওলপার্ট লিখেছেন, ১৯৭৭ সালে প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর সরকার উৎখাত হওয়ার পর জিয়াউল হকের সরকারও তাঁকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করে। এক দশক আগে আইয়ুব খানের সামরিক সরকার যে ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, জিয়াউল হকের সরকারও সেই পথ অনুসরণ করে।
ভুট্টোকে গ্রেপ্তারের পর প্রকাশিত একাধিক শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনে অবস্থানকালে তিনি ধারাবাহিকভাবে নিজেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করতেন। কিন্তু ওলপার্টের মতে, এই দাবিগুলো স্পষ্টতই মিথ্যা ছিল।
তিনি লিখেছেন, দেশে ফিরে ভুট্টো তাঁর বাবার বোম্বের সম্পত্তির ন্যায্য মূল্য পাওয়ার জন্য হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে তিনি তাঁর বন্ধুদের এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকে পাকিস্তান সম্পর্কে সচেতন করার পেছনে অনেক সময় ব্যয় করেছিলেন। আধুনিক বিশ্বে পাকিস্তানের গুরুত্ব সম্পর্কেও তিনি তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করতেন।
ওলপার্টের এই বক্তব্য ভুট্টোর রাজনৈতিক পরিচয় ও তাঁর নাগরিকত্বসংক্রান্ত আইনি অবস্থানের মধ্যে একটি পার্থক্য টেনে দেয়। তাঁর মতে, সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আদালতে দেওয়া বক্তব্যকে ভুট্টোর সামগ্রিক রাজনৈতিক আনুগত্যের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
জুলফিকার আলী ভুট্টোর বোম্বের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ছিল দেশভাগ-পরবর্তী দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের একটি জটিল আইনি ও রাজনৈতিক ঘটনা। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সম্পত্তির মালিকানা, পরিত্যক্ত সম্পত্তির আইন, নাগরিকত্ব, স্থায়ী আবাস এবং দুই রাষ্ট্রের আইনি এখতিয়ারের প্রশ্ন।
ভুট্টো ১৯৪৯ সাল থেকে প্রায় নয় বছর ধরে ভারতে নিজের সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। এই সময় তিনি আদালতে নিজেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং করাচিতে তাঁর স্থায়ী আবাস থাকার দাবি অস্বীকার করেন। একই সময়ে পাকিস্তানে তিনি পরিবারের রেখে যাওয়া সম্পত্তির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। ১৯৫৬ সালে শুরু হওয়া সেই দাবির প্রক্রিয়ায় অ্যাস্টোরিয়া হোটেলের মূল্য বিভিন্ন পর্যায়ে ১২ লাখ রুপি থেকে বাড়তে বাড়তে ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৪০০ রুপিতে নির্ধারিত হয়।
এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই তাঁর আইনি অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। ১৯৬৫ সালে ভারতের রাজ্যসভায় বিষয়টি উত্থাপিত হয়। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে তা নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়। আইয়ুব খান তাঁর ডায়েরিতে ভুট্টোকে নীতিহীন ও বিবেকহীন বলে আক্রমণ করেন। পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রতিষ্ঠার পর ভুট্টোর পক্ষ থেকে ‘ডন’ পত্রিকাকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। একই বছর ভারতের লোকসভায় তাঁর নাগরিকত্ব ও সম্পত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ১৯৭৭ সালে ভুট্টোর সরকার উৎখাতের পর জিয়াউল হকের সরকারও পুরোনো অভিযোগগুলো আবার সামনে আনে।
তবে ঘটনাটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, তা নিয়ে লেখকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এজি নুরানি আদালতের নথির ভিত্তিতে ভুট্টোর দুই দেশে দেওয়া পরস্পরবিরোধী অবস্থান তুলে ধরেছেন। সালমান তাসিরের মতে, দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে সীমান্তের ওপারে ফেলে আসা সম্পত্তি নিয়ে এ ধরনের আইনি জটিলতা অস্বাভাবিক ছিল না এবং ভুট্টোর আচরণকে সরাসরি অসততা হিসেবে দেখার যথেষ্ট কারণ নেই। অন্যদিকে, আইয়ুব খানের সরকার ও ভুট্টোর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ঘটনাটিকে তাঁর পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। স্ট্যানলি ওলপার্টও ভুট্টোর বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে উত্থাপিত কিছু অভিযোগকে স্পষ্টতই মিথ্যা বলে উল্লেখ করেছেন।
বিবিসি উর্দু থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

দৈনিক টার্গেট 

























