শুধু বাংলাদেশ বা এশিয়া নয়, পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি এখন দাঁড়িয়ে আছে ইউরোপ-আমেরিকাও। রিওয়াইল্ডিংয়ের সহজ-সুন্দর বাংলা কী হতে পারে জানা নেই, হতে পারে পুনর্বন্যকরণ। তবে এটি শুধু বন-বনানীর বিষয় নয়। বাস্তুতন্ত্রের সব জীবপ্রজাতিকে আবার বন্যরূপে ফিরিয়ে আনাই হলো এর অর্থ। তার মানে প্রকৃতিতে কোনোরূপ হস্তক্ষেপ না করে তাকে তার মতো চলতে দেওয়া। আমরা সহজেই এটা করতে পারি। বনজঙ্গল, ঝোপঝাড়, বৃক্ষ না কেটে বনের পুনরুজ্জীবনকে সাহায্য করতে পারি, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য নদীতে দেওয়া বাঁধগুলো সরিয়ে ফেলতে পারি, প্রকৃতিতে জীবপ্রজাতির সাম্যতা বজায় রাখতে নির্দিষ্ট বাস্তুতন্ত্রের অবস্থা বিবেচনা করে সেখানে জীব ছাড়তে পারি বা প্রয়োজনে সংখ্যা কমাতে পারি, পাহাড়গুলোকে ন্যাড়া না করে তার আচ্ছাদনকে প্রাকৃতিকভাবে বাড়ার সুযোগ করে দিতে পারি। বর্তমানে আমরা যা করছি তার অনেক কাজ থেকে আসলে আমাদের সরে দাঁড়ানো উচিত, প্রকৃতিকে প্রকৃতির মতো চলতে দেওয়া উচিত। মনে রাখা দরকার, প্রকৃতি শুধু মানুষের সম্পত্তি না, প্রকৃতিতে অধিকার আছে পৃথিবীর সব জীব ও অজীব উপাদানের। এসব কথা বিবেচনা করে ইউরোপ ও আমেরিকায় বর্তমানে রিওয়াইল্ডিংয়ের বেশ কিছু নীতি, প্রকল্প ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৫ সালে ইয়েলোস্টোন পার্কে একটি বন্য প্রাণী পুনঃস্থাপন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। প্রায় ৭০ বছর ধরে সে পার্কের গাছপালা কমে যাচ্ছিল। তাতে অনেক পাখি সেখান থেকে চলে যাচ্ছিল, ভালুকরাও চলে গিয়েছিল, নদীর মাছ কমে গিয়েছিল, এমনকি শীতল জলে বাসকারী অনেক প্রাণীও কমে যাচ্ছিল, নদীর পরিবর্তন ঘটছিল, নদীর পাড় ভেঙে যাচ্ছিল। সে পার্কে হরিণের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এসব ঘটছিল। ৭০ বছর ধরে হরিণ খাওয়ার মতো সেখানে কোনো নেকড়ে ছিল না। তাই সে পার্কে প্রকল্পের মাধ্যমে নেকড়ে ছাড়া হয়েছিল আর তার ফল হয়েছিল অত্যাশ্চর্য! নেকড়েরা আসায় হরিণদের আচরণে পরিবর্তন আসে। নেকড়েরা প্রায়ই নদীর পাড়ে থাকত, তাই নেকড়ের ভয়ে হরিণ নদীর পাড়ে আসা ছেড়ে দিল, এতে নদীর পাড় ভাঙা বন্ধ হলো। সেখানে গাছের চারা গজালে সেসব ছোট ছোট চারাও হরিণের দল খেয়ে ফেলত। নেকড়ের শিকারে হরিণের সংখ্যা কমে যায়। ফলে কিছু কিছু গাছ মাত্র ছয় বছরে প্রায় পাঁচগুণ লম্বা হয়ে যায়। বনের স্বাস্থ্য ফিরে আসায় সেখানে পাখি ও অন্যান্য বন্য প্রাণীও ফিরে আসে। যেসব ভালুক চলে গিয়েছিল সেগুলোও ফিরে আসে। এই একটি ঘটনাই পুনর্বন্যকরণের সুফল বোঝানোর জন্য মনে হয় যথেষ্ট। সুন্দরবন যদি কখনো বাঘশূন্য হয়ে যায়, তবে নিশ্চিত যে সেটি হরিণদের দখলে চলে যাবে, বনে হয়তো আর গাছ থাকবে না। তাই এটি কোনো ভবিষ্যতের ধারণা নয়। এটি এখন ঘটছে, বাস্তব জায়গায়, এবং এর বাস্তব ফলও পাওয়া যাচ্ছে।
মানুষের জন্য প্রকৃতি পুনরুদ্ধার কেন গুরুত্বপূর্ণ? সুস্থ বাস্তুতন্ত্র শুধু উদ্ভিদ ও প্রাণীদেরই উপকার করে না, এটি সব পার্থিব সৃষ্টিকে অলক্ষ্যে একটি চমৎকার শিকলে বেঁধে রেখেছে। বিশুদ্ধ জল, উর্বর মাটি, স্থিতিশীল আবহাওয়া—এই সবই কার্যকর প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃতি পুনরুদ্ধার সেই ব্যবস্থাগুলোকে পুনর্গঠন করতে সাহায্য করে। যখন বন ফিরে আসে, তখন তা বাতাসকে শীতল করে, মাটিতে জল ধরে রাখে। যখন নদী অবাধে প্রবাহিত হয়, তখন তা বন্যার ঝুঁকি কমায় ও মাছ চাষে সহায়তা করে। যখন জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়, তখন বাস্তুতন্ত্র আরও স্থিতিশীল হয়, বিভিন্ন চাপ সামলাতে প্রকৃতি তখন আরও সক্ষম হয়ে ওঠে।
এর একটি মানবিক দিকও রয়েছে, যা পরিমাপ করা কঠিন। পুনরুদ্ধার করা প্রাকৃতিক ভূদৃশ্যের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষেরা প্রায়ই এক গভীর সংযোগ ও সুস্থতা অনুভব করেন। প্রকৃতির সান্নিধ্য কম মানসিক চাপ ও উন্নত মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি শুধু বেঁচে থাকার বিষয় নয়, এটি জীবনের মানেরও বিষয়।
বন্য প্রাণী পুনঃস্থাপনের মূল ধারণা খুবই সহজ। এর অর্থ হলো প্রকৃতিকে আবার নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বন পুনরুদ্ধার, নদীর সংযোগ পুনঃস্থাপন, বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি ফিরিয়ে আনা, অথবা শুধু সরে দাঁড়িয়ে বাস্তুতন্ত্রকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে দেওয়া। অনেক দেশেই এ নিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বা হচ্ছে। এর ফলে জলাভূমিগুলো পুনরুদ্ধার হচ্ছে, বন্যার প্রভাব প্রতিরোধ করছে, তৃণভূমিগুলো পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে—যারা বাতাস থেকে কার্বন শোষণ করছে। বন্য প্রাণীগুলো সেসব এলাকায় ফিরে আসছে, যেখান থেকে তারা বহুদিন আগে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। এ কার্যক্রমে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিচ্ছে। কৃষক, বিজ্ঞানী, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং স্বেচ্ছাসেবকেরা প্রত্যেকে নিজ নিজ উপায়ে অবদান রাখছেন। এই প্রচেষ্টাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো একত্র হয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনছে। আমাদের দেশেও কি এরূপ ধারণার ভিত্তিতে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হবে?
অধিকাংশ দিনে সংবাদপত্রে পরিবেশসংক্রান্ত খবরগুলো পড়ে মন খারাপ হয়ে যায়, দুশ্চিন্তা আর আশঙ্কা এসে মস্তিষ্ক গ্রাস করে। বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বাড়ছে, বাসস্থান সংকুচিত হচ্ছে, বন্য প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, মানুষের অসুখ-বিসুখ বাড়ছে, বাসস্থানে থাকা অসহনীয় হয়ে উঠছে, জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে মানুষ ছুটছে দ্বীপ থেকে ডাঙার দিকে, পাহাড় থেকে বরফ গলে নদী ভাসিয়ে দিচ্ছে। মনে হয় যেন ভবিষ্যৎ এখনই ধ্বংসের মুখে। কিন্তু এটাই সম্পূর্ণ চিত্র নয়। এরই মধ্যে সারা বিশ্বে, একটি শান্ত অথচ নীরবে অনেক গভীর গল্প গড়ে উঠছে। এটি ক্ষয়ক্ষতি বা হারানোর গল্প নয়, বরং মেরামত ও পুনরুদ্ধারের গল্প। পৃথিবীর অনেক দেশে এখন রিওয়াইল্ডিংয়ের ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশে বন্য প্রাণীরা ফিরে আসছে, গাছপালা আবার জন্মাচ্ছে প্রাকৃতিকভাবে, নদীগুলো তাদের স্বাভাবিক জলধারা ফিরে পাচ্ছে। এগুলো দেখাচ্ছে যে প্রকৃতিকে সুযোগ দিলে সে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। প্রকৃতিই একমাত্র ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। ওয়াইল্ডার নেচারের প্রধান ক্যারোলিনা সোতো-নাভারোর কথা হলো, ‘বন্যকরণ মানে হলো বন্য প্রকৃতির মূল্য সম্পর্কে আমাদের চিন্তাভাবনার পরিবর্তন, শুধু আজকের জন্য নয়, বরং সুদূর ভবিষ্যতের জন্যও।’
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

দৈনিক টার্গেট 
























