দীর্ঘদিন ধরে চলা শিক্ষা খাতে অনিয়মের অভিযোগ, নিট (NEET) ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্ক এবং দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। শনিবার তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন।
পদত্যাগের বিষয়ে প্রকাশিত বার্তায় ধর্মেন্দ্র প্রধান জানান, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে। তিনি মনে করেন, দেশের তরুণদের আস্থা, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ রক্ষা করা যেকোনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক অবস্থানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ভারতের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরাই। তাই তাদের মধ্যে যেন হতাশা বা বিভ্রান্তি তৈরি না হয় এবং চলমান পরিস্থিতিকে কোনো অস্থিতিশীল শক্তি যেন কাজে লাগাতে না পারে, সে বিষয়টিও তার সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আইনগত জটিলতায় না জড়ানোর আহ্বানও জানান তিনি।
দায়িত্ব ছাড়ার আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। তিনি বলেন, সরকারি দায়িত্ব শেষ হলেও দেশের শিক্ষা ও তরুণ সমাজের উন্নয়নে কাজ করার অঙ্গীকার অব্যাহত থাকবে।
কীভাবে শুরু হয় আন্দোলন?
চলতি বছরের জুন মাসে নিট পরীক্ষা নিয়ে অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পর বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও নাগরিক প্ল্যাটফর্ম প্রতিবাদ শুরু করে। ধীরে ধীরে আন্দোলন রাজধানী দিল্লি ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে হাজারো শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবী দিল্লির যন্তর-মন্তরে সমবেত হয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা, পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে কর্মসূচি পালন করেন। পরবর্তীতে মুম্বাইসহ আরও কয়েকটি বড় শহরে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
কিছু এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হলেও আন্দোলনের আয়োজকরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
নিট পরীক্ষা ঘিরে বিতর্ক
ভারতের মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা নিট। সম্প্রতি এই পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, মূল্যায়নে অসঙ্গতি এবং পরীক্ষা পরিচালনায় অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
অভিযোগগুলোর তদন্তে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ শুরু করে এবং বিষয়টি আদালতের নজরেও আসে। পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।
সরকারের অবস্থান
চলমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এর আগে জানিয়েছিলেন, সরকারি পরীক্ষায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে বলেন, পরীক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারে সরকার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
এদিকে শিক্ষা সংস্কারক সোনম ওয়াংচুকও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে অনশন কর্মসূচি শুরু করেন। পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে বিষয়টি দেশব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
সামনে কী?
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর ভারতের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নতুন নেতৃত্ব কে নেবেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে নিট পরীক্ষা নিয়ে তদন্ত, শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার এবং আন্দোলনকারীদের দাবির বাস্তবায়ন এখন কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি মন্ত্রীর পদত্যাগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং শিক্ষার্থীদের আস্থা পুনর্গঠনের প্রশ্নকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে।
দৈনিক টার্গেট 






















