দৈনিক টার্গেট

দেশের চেতনায়

নামাজ ছাড়া রোজা কি কবুল?

ইসলামে নামাজকে দ্বীনের দ্বিতীয় স্তম্ভ এবং ঈমানের সুস্পষ্ট পরিচয় হিসেবে গণ্য করা হয়। একজন মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; বরং এটি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি। তাই নামাজ অবহেলা বা পরিত্যাগের বিষয়টি ইসলামী শরিয়তে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।

রোজা ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। তবে বহু আলেমের মতে, নামাজ ত্যাগ করে রোজা আদায় করলে সেই রোজার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। কারণ ইবাদতের মধ্যে একটি মৌলিক ভারসাম্য রয়েছে-একটি ফরজ সম্পূর্ণভাবে বর্জন করে অন্য ফরজ পালন করলে সামগ্রিক ইবাদত জীবনে ঘাটতি থেকেই যায়।

সাহাবি ও তাবেয়ীদের দৃষ্টিভঙ্গি

প্রসিদ্ধ তাবেয়ী আব্দুল্লাহ ইবনে শাক্বিক (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিগণ নামাজ ছাড়া অন্য কোনো আমল ত্যাগকে কুফরি মনে করতেন না। অর্থাৎ সালাত ছিল ঈমান ও কুফরের মধ্যবর্তী সুস্পষ্ট সীমারেখা।

এ প্রসঙ্গে কুরআনের সূরা আত-তওবার ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “তারা যদি তওবা করে, সালাত কায়েম করে এবং জাকাত আদায় করে, তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই।”

আলেমরা বলেন, এখানে সালাত কায়েম করাকে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা নামাজের অপরিহার্যতা স্পষ্ট করে।

হাদিসের আলোকে সতর্কবার্তা

সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “কোনো ব্যক্তির মাঝে এবং শিরক ও কুফরের মাঝে সংযোগ হলো সালাত ত্যাগ করা।”

আরেক হাদিসে এসেছে: “আমাদের ও তাদের মধ্যে অঙ্গীকার হলো নামাজ। যে ব্যক্তি তা ত্যাগ করল, সে কুফরি করল।”

(জামে তিরমিযী; শায়খ আলবানী হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন)

এছাড়া ইমাম বুখারী বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন: “যে ব্যক্তি আছরের নামাজ ত্যাগ করে, তার আমল নিষ্ফল হয়ে যায়।”

আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, ‘আমল নিষ্ফল হওয়া’ অর্থ হলো-সে ইবাদতের প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হওয়া। এটি নামাজ ত্যাগের ভয়াবহতা তুলে ধরে।

ইবনুল কায়্যিমের বিশ্লেষণ

প্রখ্যাত আলেম ইবনুল কায়্যিম (রহ.) তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেন, নামাজ ত্যাগের দুটি অবস্থা রয়েছে-

১. সম্পূর্ণভাবে সব নামাজ বর্জন করা।

২. নির্দিষ্ট কোনো সময় বা দিনের কোনো নামাজ ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া।

প্রথম অবস্থায় ব্যক্তির সব আমল বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর দ্বিতীয় অবস্থায় সেই দিনের আমল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাঁর বিশ্লেষণে বোঝা যায়, সালাতের গুরুত্ব কেবল একটি ইবাদতের সীমায় আবদ্ধ নয়; বরং এটি সমগ্র আমলকে প্রভাবিত করে।

রোজা কি কবুল হবে?

অনেক ফকিহ ও আলেমের মতে, কেউ যদি নামাজ আদায় না করে রোজা রাখে, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে রোজা ‘আদায়’ হয়ে যেতে পারে-অর্থাৎ সে ক্ষুধা ও পানাহার থেকে বিরত থেকেছে। কিন্তু আল্লাহর দরবারে সেই রোজা কবুল হবে কি না, তা অত্যন্ত সন্দেহজনক। কারণ যে ব্যক্তি ফরজ নামাজ ত্যাগ করে, তার ঈমান ও আনুগত্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।

তবে এ বিষয়ে আলেমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ নামাজ ত্যাগকারীকে সরাসরি কাফের মনে করেন, আবার কেউ বলেন-সে বড় গুনাহগার, কিন্তু ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না। ফলে রোজার গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নটিও এই মতভেদের সঙ্গে সম্পর্কিত।

নামাজ ও রোজা-দুটি ইবাদতই ইসলামের ভিত্তির অংশ। একটিকে অবহেলা করে অন্যটি পূর্ণতা লাভ করে না। তাই রোজার প্রকৃত সওয়াব ও আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে হলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞ আলেমরা মনে করিয়ে দেন, ইবাদতের উদ্দেশ্য কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং তাকওয়া অর্জন ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ। আর সেই পথে প্রথম ধাপই হলো-সালাত প্রতিষ্ঠা।