কূটনৈতিক ও সামরিক চ্যানেলে পাঠানো এসব বার্তা এমন একাধিক ক্রমবর্ধমান ইঙ্গিতের অংশ, যা থেকে বোঝা যাচ্ছে—ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তেহরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং দেশটিকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করার আশায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তবে এতে সংঘাত আরও বড় আকার ধারণ করার ঝুঁকি রয়েছে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের তথ্য এবং এ বিষয়ে অবগত দুই কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্য থেকে একটি অতিরিক্ত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইসরায়েলে পাঠানো হচ্ছে। এ ছাড়া, সম্ভাব্য সংঘাত বৃদ্ধির প্রস্তুতি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের যেসব সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন সেনারা হামলার ঝুঁকিতে ছিলেন, সেখান থেকে তাঁদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে আগেই জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনী তাদের গোলাবারুদের মজুত পুনরায় পূরণ করছে। একই সঙ্গে বোমারু বিমান ও যুদ্ধবিমানগুলো হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী মাসে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা প্রায় ২০টি যুদ্ধজাহাজের বহরের সঙ্গে আরও একটি বিমানবাহী রণতরির স্ট্রাইক গ্রুপ এবং মেরিন সেনাদের একটি অভিযান পরিচালনাকারী ইউনিট যুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এর মধ্যে কিছু জাহাজকে সরিয়ে নিয়ে অন্য জাহাজ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হতে পারে।
পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তবে নির্বাচনের পর বড় ধরনের হামলা চালানোর দিকেই তিনি ঝুঁকছেন। সম্ভাব্য এ হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে ইরানের অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনা।
এর বিকল্প হিসেবে ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি। গত সপ্তাহে এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা হয়তো আরেকটি ছোটখাটো “এপিক ফিউরি” অভিযান চালাতে পারি। অথবা তারা রাজি হয়ে যাবে।’ ‘এপিক ফিউরি’ বলতে তিনি বসন্তকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চালানো ব্যাপক বোমা হামলার অভিযানের কথা উল্লেখ করেন।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ‘যেসব সংবেদনশীল সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবে থাকতে পারে, আবার নাও থাকতে পারে, সেগুলো নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করবে না।’ হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইরান যাতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব ধরনের বিকল্প খোলা রেখেছেন।’ ট্রাম্প এর আগে বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি ইরানে হামলা চালাবেন না।
পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এসব সামরিক তৎপরতা ও সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতির উদ্দেশ্য হলো, ট্রাম্প হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিলে যেন তাঁর হাতে একাধিক বিকল্প থাকে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর বলেছে, এ ধরনের বিকল্প প্রস্তুত করাই তাদের দায়িত্ব।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ইসরায়েলও নতুন করে হামলা চালানোর জন্য পরিকল্পনা ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের ওপর পুনরায় হামলা শুরুর পক্ষে চাপ দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর লক্ষ্য হলো, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং শেষ পর্যন্ত দেশটির শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের ইরান কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ পরিচালক বেহনাম বেন তালেবলু বলেন, ‘ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠনের মতো কোনো ক্রমবর্ধমান হুমকিকে লক্ষ্যবস্তু করার প্রয়োজন হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উচিত, যতটা সম্ভব বিস্তারিত তথ্যসহ প্রকাশ্যে সেই প্রয়োজনীয়তার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা।’ তিনি আরও বলেন, ‘অন্যথায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এই কৌশলেই অটল থাকা উচিত।’
অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, আরও হামলা চালানো হলেও ইরান সহজে আত্মসমর্পণ করবে না। যুদ্ধের সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ২০ হাজারের বেশি হামলা সহ্য করেছে ইরান। এরপরও দেশটি পারস্য উপসাগরে জাহাজে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, মার্কিন সেনা ও যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করছে এবং আলোচনার টেবিলে কঠোর শর্ত তুলে ধরছে।
ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো, তারা এখনো ধরে নিচ্ছে যে ইরানের বিরুদ্ধে আরেক দফা হামলা চালালে, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত হানলে কিংবা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের হত্যা করলেও, কোনোভাবে দেশটির শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো সম্ভব হবে।’ তিনি বলেন, আরও বোমা হামলা চালানো হলে ইরানের শাসকগোষ্ঠী বরং নিজেদের অবস্থানে আরও অনড় হতে পারে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচির প্রতি আরও বেশি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে উঠতে পারে।
ইরান প্রকাশ্য ও গোপন কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে সতর্ক করে দিয়েছে, তাদের ওপর যেকোনো হামলার জবাবে পুরো অঞ্চলজুড়ে অর্থনৈতিক ও বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে কঠোর পাল্টা হামলা চালানো হবে। আগের যুদ্ধের আগেও ইরান একই ধরনের হুমকি দিয়েছিল। পরে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও কূটনৈতিক স্থাপনার পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামো এবং বিমানবন্দরেও হামলা চালায়।
এবার ইরান পাল্টা হামলা চালালে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কারণ, যুদ্ধের এ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ইরানের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ও চাপের মুখে পড়া নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুত পুনরায় পূরণ করতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় মিত্ররা এখন ব্যস্ত সময় পার করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরানের হাতে এখনো কয়েক শ থেকে কয়েক হাজার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত রয়েছে। লড়াইয়ের বিরতির সময়টিকে কাজে লাগিয়ে দেশটি নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করেছে এবং পাল্টা হামলার নতুন পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে। মজুত করা বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে নতুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও তৈরি করছে ইরান। দেশটি যে দ্রুতগতিতে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠন করছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা।
এদিকে, নতুন করে সংঘাতের ঢেউ ঠেকাতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যস্থতাকারীরা। তবে এখন পর্যন্ত তাঁদের প্রচেষ্টা খুব বেশি সফল হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, তেহরান আলোচনা পুনরায় শুরু করার জন্য কঠোর শর্ত তুলে ধরেছে। ফলে নতুন করে সামরিক সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক উদ্যোগ এখনো বড় ধরনের অচলাবস্থার মুখে রয়েছে।

দৈনিক টার্গেট 





















