হতাশার এই ফলাফলের মধ্যে ব্যতিক্রম হয়ে উঠেছেন সুপ্রিয়া তাম্মী মিথিলা। চার কলেজের ৮৯৬ পরীক্ষার্থীর মধ্যে একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী তিনি। বদলগাছী সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এই সাফল্য অর্জন করেছেন মিথিলা। তিনি উপজেলার পারিচা গ্রামের বাসিন্দা শামীম হোসেনের মেয়ে।
মিথিলার এ সাফল্যের পেছনে রয়েছে নিয়মিত পড়াশোনা, ক্লাসে উপস্থিতি, শিক্ষকদের সহযোগিতা এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস। প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন শেষ করার চেষ্টা করেছেন তিনি। কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে শিক্ষকদের সহযোগিতা নিয়েছেন।
মিথিলা বলেন, ‘আমার এই সাফল্য প্রথমেই বাবা-মাকে দিতে চাই। তাঁরা সব সময় আমাকে সহযোগিতা করেছেন। এরপর আমার কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষিকা রওশন আরা খান সোমা ম্যাডাম ও আইসিটির শিক্ষক শহিদুল ইসলাম স্যারকে কৃতিত্ব দিতে চাই। তাঁরা আমাকে সব সময় অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। আমি নিয়মিত ক্লাস করতাম এবং প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন প্রস্তুত করতাম। কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে ম্যাডাম বুঝিয়ে দিতেন।’
জিপিএ-৫ পাওয়াই মিথিলার শেষ লক্ষ্য নয়। তাঁর স্বপ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়াশোনা করা। সেই লক্ষ্য পূরণে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
মিথিলার সাফল্যের পেছনে শিক্ষকদের অনুপ্রেরণার কথাও উঠে এসেছে। বদলগাছী সরকারি কলেজের শিক্ষক রওশন আরা খান সোমা বলেন, ‘শুধু মিথিলা নয়, অন্য শিক্ষার্থীদেরও একইভাবে অনুপ্রেরণা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমিও গ্রাম থেকে অনেক সংগ্রাম করে আজকের জায়গায় এসেছি। আমার জীবনের গল্পগুলো তাদের সঙ্গে ভাগ করেছি। আমি আশাবাদী, মিথিলা তার স্বপ্নের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাবে।’
আইসিটি শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আজকাল অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসে উপস্থিত হতে চায় না। তবে যারা ক্লাসে আসে, তাদের হাতে-কলমে শেখানোর পাশাপাশি অনুপ্রেরণা দেওয়ার চেষ্টা করি। মিথিলাও নিয়মিত ক্লাস করেছে। আমি আশাবাদী, সে ভবিষ্যতে ভালো কিছু করবে।’
মিথিলার ব্যক্তিগত সাফল্য আনন্দের হলেও উপজেলার চার কলেজের সামগ্রিক ফলাফল উদ্বেগজনক। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বদলগাছী সরকারি কলেজ থেকে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী পাস করেছেন। এ কলেজের ৪৬৮ পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১৬১ জন। পাসের হার ৩৪ দশমিক ৪০ শতাংশ।
অন্যদিকে বদলগাছী মহিলা ডিগ্রি কলেজের ১২৭ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ১৩ জন। পাসের হার ১০ দশমিক ২৩ শতাংশ। গোবরচাঁপাহাট ডিগ্রি কলেজের ১৫৪ পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১৭ জন। পাসের হার ১১ দশমিক ৩ শতাংশ।
সবচেয়ে কম পাসের হার কোলা আদর্শ ডিগ্রি কলেজে। এ কলেজের ১৪৭ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ১৪ জন। পাসের হার ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ এ কলেজের ৯০ শতাংশের বেশি পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন।
চার কলেজে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রমের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে তিনটি কলেজে পাসের হার ১২ শতাংশের নিচে নেমে আসার কারণ অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি, পাঠদানের পরিবেশ, শিক্ষকসংকট, পাঠ্যক্রম শেষ করা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
স্থানীয় অভিভাবক ইবনে তাহির মুহাম্মদ নয়নসহ কয়েকজন বলেন, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসমুখী করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে শিক্ষকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বাড়িতে শিক্ষার্থীদের মোবাইল আসক্তি কমাতে অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে।
বদলগাছী সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম শেখসহ উপজেলার অন্য তিন কলেজের অধ্যক্ষরাও ফলাফলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা জানান, এ ফলাফলে তাঁরা খুশি নন। আগের সরকারের নীতি ছিল শতভাগ পাস নিশ্চিত করা। বর্তমান সরকারের নীতি শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসমুখী করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
একদিকে ৬৯১ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার হতাশা, অন্যদিকে একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া মিথিলার সাফল্য। এই দুই বিপরীত চিত্র বদলগাছীর কলেজ শিক্ষার বাস্তবতা নতুন করে সামনে এনেছে।

দৈনিক টার্গেট 




















