বাংলাদেশে আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের আলোচনা যখন তুঙ্গে, তখন দেশের ভেতরে অস্থিরতা ও অপরাধ প্রবণতা যেন প্রতিদিন নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে।
খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও দাঙ্গার মতো ঘটনা এখন যেন প্রকাশ্যে ঘটছে যা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রশাসনের দক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে, যা কখনও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায়, কখনও বা রাজনীতির নামে ক্ষমতার দাপট দেখানোর মধ্য দিয়ে হচ্ছে। খুন-ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধগুলো দিনে-দুপুরে ঘটছে, অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসনের চোখের সামনেই।
মিরপুরের এক দোকান মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা চাওয়া হয়। না দিলে দোকান বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি আসে। পুলিশকে জানালেও কোনো ব্যবস্থা হয় না।”
নারীদের প্রতি সহিংসতা নতুন কিছু নয়, তবে সম্প্রতি এই প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। সাভার, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলায় ধর্ষণের শিকার হয়েছেন স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্রী থেকে শুরু করে গৃহবধূ পর্যন্ত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচার বা শাস্তির কোনো নজির দেখা যায় না, যা সমাজে এক ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করছে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের মধ্যেই চলেছে ক্ষমতার লড়াই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে দুই পক্ষের দফায় দফায় বক্তব্য ও পাল্টা-বক্তব্য চললেও, সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কিংবা ন্যায়ের প্রত্যাশার বিষয়গুলো কোথাও আলোচনায় নেই।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি-এর একজন বিশ্লেষক বলেন, “যখন একটি রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে পড়ে যায়, তখন অপরাধ দমন নয়, বরং অপরাধ রক্ষা করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।”
এতসব ঘটনার মাঝে দেশের সাধারণ মানুষ ক্রমেই হতাশ ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, অন্যদিকে নিরাপত্তার অভাব সব মিলিয়ে মানুষ দিন দিন রাষ্ট্র ও শাসনের ওপর আস্থা হারাচ্ছে।
শাহবাগ মোড়ের এক রিকশাচালক বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, ভোট দিলেই কী আর না দিলেই কী! কিন্তু অন্তত একটু শান্তিতে তো থাকতে চাই।”
বাংলাদেশ এই মুহূর্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মোড়ে দাঁড়িয়ে। তবে রাজনৈতিক সমঝোতা আর ক্ষমতা ভাগাভাগির বাইরে গিয়ে যদি সরকার ও রাজনৈতিক নেতারা দেশের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতি মনোযোগ না দেন, তবে সামাজিক ভারসাম্য এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাবে যা শুধুমাত্র রাজনৈতিক সংকট নয়, মানবিক সংকটও হয়ে উঠবে।
















Leave a Reply