গত শনিবার অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই তাঁর একটি ব্লগ পোস্টে বলেন, এআই মডেলের সক্ষমতা যেভাবে বাড়ছে, তা অপব্যবহারের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলছে। তিনি কোম্পানিগুলোকে কিছু সময়ের জন্য উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান জানান।
দারিওর এই অবস্থানকে সমর্থন করেন ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান ও এক্সএআইয়ের প্রধান ইলন মাস্ক। অল্টম্যান জানান, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে ওপেনএআই চলতি বছর শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত (আইপিও) হওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে।
এই ঘোষণার পর ওয়াল স্ট্রিটের প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক সূচকের ফিউচার প্রায় দুই শতাংশ কমে যায়। সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।
বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার শেয়ার প্রায় তিন শতাংশ কমেছে। অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেস (এএমডি) হারিয়েছে প্রায় ছয় শতাংশ আর মেটা ও অ্যামাজনের শেয়ারও এক শতাংশের বেশি নেমে গেছে।
ইউরোপেও একই চিত্র দেখা গেছে। প্রযুক্তি সূচক প্রায় আড়াই শতাংশ কমেছে। চিপ যন্ত্রপাতি নির্মাতা এএসএমএলের শেয়ার প্রায় ছয় শতাংশ ও ইনফিনিয়নের শেয়ার আট শতাংশের বেশি পড়ে যায়। জার্মানির এআই অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান সিমেন্স এনার্জির শেয়ারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এশিয়ায় সফটব্যাংকের শেয়ার একপর্যায়ে ১৩ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (টিএসএমসি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার এসকে হাইনিক্সের শেয়ারেও বড় পতন দেখা যায়।
সুইসকোট ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ইপেক ওজকারদেস্কায়া বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, যদি এআই প্রতিযোগিতার গতি সত্যই কমে যায়, তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এখন পর্যন্ত তৈরি অবকাঠামোগুলোর বিশাল খরচের ভার কে বইবে? প্রত্যাশিত কম্পিউটিং চাহিদা কমে গেলে ঋণঝুঁকিও বাড়তে পারে।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান দারিও আমোদেই সতর্ক করে বলেন, আগামী ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টগুলো পুরো ইন্টারনেট ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হতে পারে, যা শত শত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি সাধন করবে। গত সপ্তাহে অ্যানথ্রপিক এক প্রতিবেদনে জানায়, তাদের ‘ক্লোড’ মডেলটিকে অস্ত্র তৈরি, সাইবার অপারেশন ও নজরদারির কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা চালিয়েছে কয়েকটি চক্র।
অ্যানথ্রপিকের গবেষক জ্যাকব কক্সন পদত্যাগ করে মন্তব্য করেন, এআই খাতের নির্মাতারা নিজেরাই মনে করছেন চলতি দশকের শেষ নাগাদ এই প্রযুক্তি মানবজাতি ধ্বংসের কারণ হতে পারে।
তবে এআই সমালোচকদের কঠোর সমালোচনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল রোববার বলেন, কিছু ‘নেতিবাচক শক্তি’ বাস্তবে ঘটবে না এমন অবাস্তব পরিস্থিতি তৈরি করছে। তিনি বলেন, বিশ্ব প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে শীর্ষে রাখতেই তিনি এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে চান।
এদিকে বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস অ্যানথ্রপিকের এই বক্তব্যকে চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি রুখে দেওয়ার একটি ‘স্নায়ু যুদ্ধের কৌশল’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
প্রযুক্তি খাতের এমন থমথমে পরিস্থিতির মধ্যেও অনেক বিনিয়োগকারী এ সতর্কবার্তাকে কৌশলগত নাটক হিসেবে দেখছেন। ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের পূর্বাভাস দেওয়া বিখ্যাত বিনিয়োগকারী মাইকেল বুরি এক্সে এক পোস্টে বলেন, এআই নির্বাহীদের এই সতর্কতা শুধুই অতিরঞ্জিত সস্তা প্রচার। এর আড়ালে তাঁরা মূলত এআই প্রবৃদ্ধির অনিয়ন্ত্রিত ধীরগতিকে ঢাকতে চাইছেন।
মর্গান স্ট্যানলি ও ডয়চে ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করছে, বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার কারণে কোনো কোম্পানি বা দেশ স্বেচ্ছায় এআই উন্নয়ন থেকে সরে দাঁড়াবে না। এমনকি ২০২৭ সালের মধ্যে এআই অবকাঠামো খাতে ব্যয় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তবে স্যাক্সো ব্যাংকের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ চারু চানানা জানান, দীর্ঘ মেয়াদে চিপ ও এআই শেয়ারের ওপর এই উদ্বেগের চাপ বজায় থাকবে। বাজার মূল্যায়ন যখন অত্যধিক বেশি থাকে, তখন সামান্য বিলম্বের আশঙ্কাও বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা তুলে নিতে বাধ্য করে।
শিল্পের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো মূলধনি যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল। একটি দেশে বিনিয়োগ কতটা বাড়ল কিংবা কমল, নির্দিষ্ট সময়ের হিসাবে এ দুই উপকরণের আমদানি হ্রাস-বৃদ্ধির প্রবাহ থেকেই বোঝা যায়।
দেশের পুঁজিবাজারে এখন গুজব, অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকট সমান্তরাল রেখায় চলছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর আচরণও বেশ অস্থির হয়ে উঠছে। সপ্তাহের বেশির ভাগ কার্যদিবসে বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারের দরপতনের পরিস্থিতি তাঁদের শঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
দেশে সবুজ বিনিয়োগ ও টেকসই অর্থায়নের গতি থমকে গেছে। এ দুই খাতে অর্থায়ন আশঙ্কাজনক কমেছে। এতে ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতিও দুর্বল হচ্ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি খরচ ও দূষণ কমিয়ে সবুজ উৎপাদন ও টেকসই শিল্পায়নের পথেও বড় বাধা তৈরি হয়েছে।
দৈনিক টার্গেট 


























