জমিতে পানি না থাকায় রোদ ও গরমে কয়েক হাজার একরের ধানগাছে ফলন আসার আগেই শুকিয়ে গেছে। ফেটে গেছে খেতের জমি। আবার সতেজ থাকা ধানগাছেও ফলন আসেনি। সব মিলিয়ে নোয়াখালীতে চলতি মৌসুমে আমনের ফলনে বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে যেমন খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে, তেমনি ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়বেন এই অঞ্চলের কৃষকেরা।
গত শুক্রবার সরেজমিনে সদর, সুবর্ণচর ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে আমনখেতের এমন বিপর্যয়ের দৃশ্য দেখা গেছে।
সুবর্ণচরের চরওয়াপদা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষক মো. ইউছুফ জানান, চলতি মৌসুমে তিনি আট শতক জমিতে আমন আবাদ করেছেন। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর খেতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো খেতের মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। বেশির ভাগ ধানগাছ ফলন আসার আগেই শুকিয়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে, আগুনের তাপে পুড়ে বা ঝলসে গেছে। আবার যেসব খেতে আশপাশের গাছের ছায়ার নিচে পড়েছে, সেগুলো ঝলসে না গেলেও তাতে নেই কাঙ্ক্ষিত ফলন। ফলনের বেশির ভাগই চিটা হয়ে আছে।
একই উপজেলার চর আমান উল্লাহ ইউনিয়নের কৃষক মফিজ উল্লাহ বলেন, ‘আমন চাষের আগে প্রায় প্রতিদিন বৃষ্টি ছিল। প্রথম দিকে বন্যা হওয়ার শঙ্কায় আমরা এবার আমন চাষের আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। বৃষ্টিপাত বন্ধ হওয়ার পর চারা রোপণ শুরু করি। কিন্তু ফলন আসার আগে-পরে মিলে দুই মাসের বেশি সময় ধরে আর বৃষ্টি হচ্ছে না। অথচ ফলন হওয়ার সময় বৃষ্টি ও পানি খেতের জন্য জরুরি। আশপাশে পানির কোনো উৎস না থাকায় পানি সেচ দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। এরই মধ্যে আমার এক একর জমির বেশির ভাগ ধানগাছ শুকিয়ে গেছে। আশানুরূপ ফলন আসেনি। ব্যাংকঋণ এবং সুদে টাকা নিয়ে আবাদ করে এখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি।’
চরওয়াপদা ইউনিয়নের কৃষক মো. মুরাদ উদ্দিন বলেন, ‘দুই মাসের বেশি সময় ধরে বৃষ্টি না থাকায় আমার সাড়ে তিন একর জমির ফসল ঝলসে গেছে। যেটুকু আছে, সেটুকুতে ফলন তেমন হয়নি। এখন যে অবস্থা, তাতে পথে বসা ছাড়া উপায় নেই।’
সদর উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মতিন বলেন, ‘ফসলের যে অবস্থা তাতে এবার ধান ঘরে তোলার আশা ছেড়ে দিয়েছি। এ বছরের জুলাইয়ে অতিবৃষ্টির কারণে নির্দিষ্ট সময়ে আবাদ শুরু করতে পারিনি। আবার যখন ফলন আসার কথা, তখন বৃষ্টি না থাকায় গাছ পুড়ে গেছে।’
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরএলাহী ইউনিয়নের কৃষক রহিম উদ্দিন বলেন, ‘প্রতিবছর ধান আবাদে আমরা ধারদেনা করে থাকি। আবাদের জন্য প্রতিজন শ্রমিক নিতে হয়েছে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা দিয়ে। এরপর সার, কীটনাশকের খরচ আছে। এখন দূর থেকে পানি আনতে হলে প্রতি একরে পাঁচ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হবে। এত টাকা বিনিয়োগ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় ১ লাখ ৭০ হাজার ৬২২ হেক্টর জমিতে রোপা আমন আবাদ হয়েছে। সে হিসাবে ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৯৫০ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নোয়াখালী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আশীষ কুমার কর বলেন, ‘আমরা ভবিষ্যতে পানির প্রাকৃতিক উৎস বাড়ানো এবং লবণসহিষ্ণ জাত আবাদে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে কাজ করছি। এ ছাড়া চলতি মৌসুমে আমন চাষে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরিরও কাজ চলছে। চূড়ান্ত তালিকা হাতে পেতে কিছুটা সময় লাগবে। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারিভাবে প্রণোদনা ও সহযোগিতা করা হবে।’

দৈনিক টার্গেট 




















