দৈনিক টার্গেট

দেশের চেতনায়

সুন্দরবনে বনবিভাগের অভিযানে ৫ জেলে আটক

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বন বিভাগ দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধভাবে বিষ দিয়ে মাছ ধরার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের নলিয়ান স্টেশনের আওতাধীন এলাকায় পৃথক দুটি অভিযানে ৫ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। অভিযানে আটককৃতদের কাছ থেকে তিনটি নৌকা, জাল, বিষযুক্ত চিংড়ি, সাদা মাছ এবং বোতলজাত বিষ উদ্ধার করা হয়।

বন বিভাগের সূত্রে জানা যায়, নলিয়ান স্টেশনের কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেনের নেতৃত্বে বিকেল ৫টার দিকে কয়রার ৪০ নম্বর কম্পার্টমেন্টের মার্কি খাল এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় ৪ নম্বর কয়রা গ্রামের বাসিন্দা হামিদ গাজী (৪৫) কে বিষ দিয়ে মাছ ধরার অভিযোগে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে একটি ডিঙ্গি নৌকা, একটি ভেশালি জাল, প্রায় ৫ কেজি বিষযুক্ত চিংড়ি এবং লেভেলবিহীন প্লাস্টিক বোতলে রাখা বিষ উদ্ধার করা হয়।

এর আগে একই দিন বিকেল ৪টার দিকে একই এলাকায় আরেকটি পৃথক অভিযান চালানো হয়। এ অভিযানে মামুন ঢালী (৪১), শরিফুল ইসলাম (৪৫), মো. হাসান ঢালী (৪৫) এবং মো. সাহেব আলী (৪০) নামের চারজনকে আটক করে বন বিভাগ। তাদের কাছ থেকে মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত দুটি ডিঙ্গি নৌকা, দুটি কল জাল এবং প্রায় ১০ কেজি সাদা মাছ জব্দ করা হয়।

বিষ দিয়ে মাছ ধরার ক্ষতিকর প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে- বিষ দিয়ে মাছ ধরার ফলে শুধু মাছ নয়, পানির অন্যান্য জীববৈচিত্র্যও ধ্বংস হয়। পানির স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়, যা সুন্দরবনের সামুদ্রিক ও স্থলজ পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। এ ধরনের কার্যকলাপের কারণে একদিকে নদী ও খালের মাছের প্রজনন ব্যাহত হয়, অন্যদিকে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যও মারাত্মকভাবে বিপন্ন হয়।

বন বিভাগ জানায়, আটককৃতদের বিরুদ্ধে সুন্দরবন আইন অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়রা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাগুলো রুজু হয়েছে। আটক জেলেদের আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হবে।

বন বিভাগের অবস্থান

নলিয়ান স্টেশনের কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন বলেন- সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে আমাদের নিয়মিত টহল ও অভিযান চালাতে হয়। বিষ দিয়ে মাছ ধরা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এর কারণে পরিবেশে ভয়াবহ ক্ষতি হয়। আমরা কাউকে এ ধরনের কার্যকলাপের সুযোগ দেব না।

তিনি আরও জানান, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় স্থানীয় জনগণকেও সচেতন হতে হবে। বন বিভাগের সীমিত জনবল ও সম্পদ দিয়ে প্রতিদিন টহল চালানো সম্ভব নয়। তাই জনগণের সহযোগিতাই সুন্দরবন রক্ষার মূল শক্তি।

সচেতনতার আহ্বান

পরিবেশবিদরা মনে করেন, অবৈধভাবে মাছ ধরা বন্ধ করতে শুধু অভিযানই যথেষ্ট নয়, বরং সাধারণ মানুষকে সচেতন করা জরুরি। অনেক জেলে না জেনে বা বাধ্য হয়ে এ ধরনের পদ্ধতিতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাই তাদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

অন্যদিকে, স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর নজরদারির পাশাপাশি গণমাধ্যমের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে যেমন সাধারণ মানুষকে সচেতন করা সম্ভব, তেমনি অপরাধীদেরও সতর্ক করা যায়।

সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং এটি শুধু বাংলাদেশের গর্ব নয়, বৈশ্বিক সম্পদও বটে। এই বনের প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার, প্রশাসন এবং জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুক্রবারের অভিযানে ৫ জন জেলের আটক হওয়া এবং বিষসহ মাছ-নৌকা-জাল জব্দ করা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এ ধরনের অভিযান নিয়মিত চালানো না হলে সুন্দরবন ও এর জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে।