বাঙালির প্রেরণার কবি নজরুলের জন্মদিন আজ

জাতীয়
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর ১২৭তম জন্মবার্ষিকী আজ। সাম্য, মানবতা, প্রেম ও বিদ্রোহের অমর বার্তাবাহী এই মহান কবিকে স্মরণে দেশজুড়ে আয়োজন করা হয়েছে নানা কর্মসূচি। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, মানিকগঞ্জ ও কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি, নজরুলসংগীত পরিবেশনা ও স্মরণানুষ্ঠান।

এবারের জন্মবার্ষিকীকে ঘিরে সরকার নিয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানে আগামী এক বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ উপলক্ষে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, জেলা প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বছরব্যাপী নানা আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে।

ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নজরুল একাডেমি প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক উৎসবের মাধ্যমে মূল আয়োজন উদযাপিত হচ্ছে। সেখানে কবির সাহিত্য, সংগীত ও দর্শন নিয়ে আলোচনা ছাড়াও পরিবেশিত হচ্ছে তাঁর অমর সৃষ্টি। একইসঙ্গে রাজধানীর বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিনজরুল ইনস্টিটিউট-এও অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।

১৮৯৯ সালের ২৪ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। দারিদ্র্য ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েই কেটেছে তাঁর শৈশব ও কৈশোর। জীবিকার প্রয়োজনে কখনও রুটির দোকানে কাজ করেছেন, আবার কখনও লেটো গানের দলে যোগ দিয়েছেন। পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ৪৯ নম্বর বাঙালি পল্টনের সদস্য হিসেবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও অংশ নেন।

সেনাবাহিনীতে থাকা অবস্থাতেই তাঁর সাহিত্যচর্চার সূচনা ঘটে। করাচি সেনানিবাসে বসে তিনি গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ রচনায় মনোনিবেশ করেন। ১৯১৯ সালে প্রকাশিত “বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী” তাঁর সাহিত্যজীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়। এরপর একে একে সৃষ্টি করেন অসংখ্য কালজয়ী রচনা।

১৯২১ সালে রচিত “বিদ্রোহী” কবিতা বাংলা সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা করে। একই সময়ের “ভাঙার গান” মানুষের মনে জাগিয়ে তোলে মুক্তির চেতনা। তাঁর “অগ্নিবীণা” কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পর বাংলা কবিতায় সৃষ্টি হয় নতুন ধারার। বিদ্রোহ, প্রেম, সাম্য ও মানবতার মিশেলে নজরুলের সাহিত্য হয়ে ওঠে যুগান্তকারী।

শুধু কবিতাই নয়, বাংলা সংগীতেও তাঁর অবদান অনন্য। প্রায় চার হাজার গান রচনা ও সুরারোপের মাধ্যমে তিনি বাংলা সংগীতকে দিয়েছেন নতুন মাত্রা। পাশাপাশি শিশুতোষ সাহিত্যেও রয়েছে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। “লিচু-চোর”, “খুকী ও কাঠবিড়ালি” কিংবা “খাঁদু-দাদু” আজও শিশুদের কাছে সমান জনপ্রিয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান কবিকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং জাতীয় কবির মর্যাদায় ভূষিত করেন। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।

সাহিত্যবোদ্ধাদের মতে, বর্তমান বিশ্বে বৈষম্য, ধর্মীয় বিভাজন ও অসহিষ্ণুতার সময়ে নজরুলের সাম্য ও মানবতার দর্শন নতুনভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। তাঁর সাহিত্য ও সংগীত আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, স্বাধীনতার চেতনা এবং মানবিক সমাজ গঠনের প্রেরণা জোগায়। তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে থাকবেন।

দৈনিক টার্গেট

দৈনিক টার্গেট বাংলাদেশী সংবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।