বিলুপ্তির পথে সুন্দরবনের ভেষজ ভান্ডার, হারিয়ে যাচ্ছে বংশানুক্রমিক কবিরাজি বিদ্যা

  • দৈনিক টার্গেট
  • প্রকাশ: ১২:১২:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৪ বার পঠিত হয়েছে

ভোরের বিষণ্ন আলোয় নদীর তীরে কাদা-জল পেরিয়ে নিজের কাকার বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়ালেন চল্লিশ বছর বয়সী সুরঞ্জন রাপ্তান।

‘কাকা, বাড়ি আছেন?’ বাইরে থেকে হাঁক দিলেন সুরঞ্জন।

ঘর থেকে বের হয়ে এলেন মাঝারি গড়নের পেটানো চেহারার মৌয়াল চপল রাপ্তান। কিছুটা বসে যাওয়া গলায় উত্তর দিলেন, ‘সুরঞ্জন? আয়, বোস। গতকাল বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করেছি, খুব সর্দি-কাশি হয়েছে। তাই একটু জিরাচ্ছি।’

সুরঞ্জন উত্তর দিলেন, ‘খারাপ খবর। তুলসী পাতা আর মধু দিয়ে গরম চা খাও, আরাম পাবে। আমি এখন বসব না কাকা, বনে যাব কিছু গাছগাছড়া সংগ্রহ করতে। তোমার নৌকাটা একটু নেব।’

কাকা নৌকার খোঁজ জানিয়ে দিলে সুরঞ্জন হাঁটা দিলেন নদীর ঘাটে। ‘ঠিক আছে কাকা, বিশ্রাম নাও। শরীর বেশি খারাপ লাগলে আমি ওষুধ পাঠিয়ে দেব’, পরামর্শ দেন তিনি।

এই নদীর ওপারেই বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, যা সুরঞ্জনের জীবনের সিংহভাগ জুড়ে একটি বিশাল প্রাকৃতিক ফার্মেসি বা ওষুধ ভান্ডার হিসেবে কাজ করে আসছে।

নদীতে উল্টে রাখা ছোট নৌকাটি সোজা করে পানিতে ভাসালেন সুরঞ্জন। তীরের কাদায় তাঁর পা অনেকটাই দেবে যাচ্ছিল। নৌকায় উঠে ঝুলন্ত পা দুটো নদীর জলে ধুয়ে তিনি এগোতে থাকলেন সুন্দরবনের দিকে।

বনের সীমানায় পা রাখতেই নোনা জল আর কাদার পরিচিত গন্ধ ভেসে আসে। চারদিকে ম্যানগ্রোভ গাছের শ্বাসমূলগুলো কাঁকড়ার বাঁকা চিমটার মতো মাটি ফুঁড়ে উঠে আছে। মাছরাঙার তীক্ষ্ণ ডাক, পোকামাকড়ের ভ্যানভ্যানানি আর বাতাসে পাতার মর্মর শব্দ। খালি পায়ে হাঁটছেন সুরঞ্জন। তাঁর মতে, খালি পায়ে হাঁটলে মাটির স্পর্শ পাওয়া যায় এবং নিঃশব্দে চলাফেরা করা যায়; জুতা পরলে কাদায় পা পিছলে যাওয়ার ভয় থাকে।

এক জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে কাদায় ছোট একটি গর্ত দেখিয়ে সুরঞ্জন বললেন, ‘এইমাত্র একটা হরিণ এখান দিয়ে হেঁটে গেছে।’

একটু এগিয়ে একটি গুল্মজাতীয় গাছের পাতা স্পর্শ করে বললেন, ‘পেট ব্যথা হলে এই পাতা পানিতে ফুটিয়ে খেতে হয়।’

তার কয়েক পা দূরে একটি উঁচু গাছের ছাল স্পর্শ করে বললেন, ‘এই ছাল চেঁচে পানির সঙ্গে মিশিয়ে খেলে পুরোনো কাশি দূর হয়।’

এরপর তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন একটি প্রবীণ সুন্দরী গাছের সামনে। ডিম্বাকৃতির গাঢ় সবুজ পাতার দিকে তাকিয়ে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘এই গাছটার নামানুসারেই এই বনের নাম হয়েছিল সুন্দরবন। কিন্তু এখন এই সুন্দরী গাছ বুনো এলাকায় বিরল হয়ে উঠেছে। আজ এখানে এটা দেখতে পাওয়া আমাদের ভাগ্য।’

সুরঞ্জনের মতে, ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’র পর থেকে বনের চেহারা দ্রুত বদলাতে শুরু করে। ‘আইলার আগে বন এত ঘন ছিল যে ভেতরে সূর্যের আলো পৌঁছাত না। কিন্তু তারপর থেকে বন পাতলা হতে শুরু করে। এখন বনের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে’, বলেন সুরঞ্জন।

২০১৫ বা ২০১৬ সালের পর থেকে পরিবর্তনটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেসব জায়গায় আগে ঘন ছায়া থাকত, সেখানে রোদ পড়তে শুরু করে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে চেনা ওষুধি গাছগুলো বন থেকে একে একে উধাও হতে শুরু করে।

সুরঞ্জন রাপ্তান ২১ বছর ধরে কবিরাজি করছেন। এই বিদ্যা তিনি শিখেছেন তাঁর বাবার কাছ থেকে, আর তাঁর বাবা শিখেছিলেন দাদার কাছ থেকে। এই বিদ্যা কোনো বই-পুস্তকে লেখা ছিল না। কোন গাছ চিনতে হবে, কোথায় তা পাওয়া যাবে, গাছের কোন অংশ কখন তুলতে হবে এবং কীভাবে ওষুধ তৈরি করতে হবে—সবই অর্জিত হয়েছে মুখের কথায়, চর্চায় এবং স্মৃতিতে।

কয়রার নিজ বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে নদীর ওপারে সুন্দরবনের সবুজ চাদর দেখা যায়। সুরঞ্জন স্মৃতিচারণ করে বলেন, বিশ বছর আগে তাঁর বাড়ির উঠানে প্রতিদিন দূর-দুরান্ত থেকে বহু রোগী এসে ভিড় করতেন। নারী, পুরুষ, শিশুদের নিয়ে মায়েরা আসতেন। জ্বর, সর্দি-কাশি, পেটের পীড়া বা শরীর ব্যথার চিকিৎসার জন্য তাঁর শরণাপন্ন হতেন সবাই। অনেকে আবার জঙ্গল থেকে তুলে আনা পাতার পুঁটলি নিয়ে আসতেন গাছ চিনে নেওয়ার জন্য।

কিন্তু গত এক দশকে এই ভিড় অনেকটাই পাতলা হয়ে এসেছে।

একদিকে বন থেকে ওষুধি গাছ হারিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে গ্রামে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার প্রসার। ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় ‘কমিউনিটি ক্লিনিক’ কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করে। বর্তমানে দেশজুড়ে প্রায় ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক কাজ করছে, যার মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের অনেকে হাতের নাগালে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধ পাচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় ফার্মেসিগুলোতে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই সহজে ওষুধ কেনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ফলে নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে কবিরাজদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তবে এখনো যারা কবিরাজদের কাছে আসেন, তাদের প্রধান কারণ দারিদ্র্য ও শহরের চড়া চিকিৎসা খরচ।

সুরঞ্জনের বাড়ির থেকে তিন বাড়ি দূরে থাকেন ৩২ বছর বয়সী দীপা মণ্ডল। বারান্দায় বসে স্বামী ও ছয় বছরের সন্তানকে নিয়ে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন তিনি।

দীপা বলেন, ‘বাড়িতে কারও জ্বর, সর্দি, কাশি বা মেয়েদের কোনো শারীরিক সমস্যা হলে আমি প্রথমেই সুরঞ্জন দার কাছে যাই। তিনি ভেষজ তৈরি করে দেন।’

দীপার স্বামীর হেপাটাইটিস-বি রোগ রয়েছে। জন্ডিস বা শারীরিক দুর্বলতা কমাতে তাঁরা স্থানীয় ভেষজ ওষুধি বড়ি ব্যবহার করেন। সেগুলো সুরঞ্জন রাপ্তান তৈরি করে দেন।

খালি পায়ে গোলাপি শাড়ি পরা দীপা ছেলেকে ভাত খাওয়াতে খাওয়াতে বলেন, ‘শহরের ডাক্তারের কাছে যাওয়ার মতো টাকা আমাদের নেই। শহরের ক্লিনিক অনেক দূরে, ওষুধ আর যাতায়াত খরচ অনেক বেশি। কিন্তু সুরঞ্জন দা চিকিৎসা বা ওষুধের জন্য কোনো দিন এক টাকাও নেন না।’

কয়রা এলাকায় প্রাইভেট ডাক্তারের চেম্বারে দেখাতে গেলে পরামর্শ ফি বাবদ ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ হয়, যা স্থানীয় দরিদ্র মানুষের জন্য বিশাল বোঝা।

একই সড়কের খানিকটা দূরে ৮০ বছর বয়সী শুভদ্রা মণ্ডল শেষ বিকেলে নিজের ছাগলগুলোকে সামলাচ্ছিলেন। বাত ও হাঁটুর ব্যথায় ভোগা এই বৃদ্ধা বলেন, ‘আমার ভাগনে সুরঞ্জনের কাছ থেকে আমি ভেষজ ওষুধ নিই। গাছগাছড়ার ছাল-পাতা মধুর সঙ্গে মিশিয়ে বানিয়ে দেয়। খেলে ব্যথার কিছুটা উপশম হয়। শহরে ডাক্তার দেখাতে গেলে অনেক টাকা চায়। ছেলে বনে মাছ ধরে সংসার চালায়, অত টাকা আমরা পাব কোথায়!’

উপকূলীয় এই অঞ্চলে শুধু চিকিৎসায় নয়, সুপেয় পানির ক্ষেত্রেও নোনা জলের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে চললেও শুষ্ক মৌসুমে খাওয়ার পানির জন্য স্থানীয় মানুষদের দিনে ৪ কিলোমিটার পথ হেঁটে পুকুর থেকে পানি এনে রান্না ও পানের কাজ চালাতে হয়।

১০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে প্রায় ২৭ লাখ মানুষ বসবাস করেন। শত শত বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষ বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বারবার আঘাত হানা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের ফলে বনের পানিতে লবণাক্ততা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে নদীর পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ ২১ থেকে বেড়ে ৩৩ পার্টস পার থাউজেন্ডে (ppt) পৌঁছেছে। একই সময়ে উপকূলের মাটিতে লবণাক্ততা বেড়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিকস অ্যান্ড প্ল্যান্ট ব্রিডিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রহিম বলেন, ‘লবণাক্ততা বনের উদ্ভিদ কূলের ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। নোনা জল সহ্য করতে পারা প্রজাতিগুলো টিকে থাকলেও, সুরঞ্জনদের মতো কবিরাজরা যেসব অত্যন্ত সংবেদনশীল ওষুধি গাছের ওপর নির্ভর করতেন, সেগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সুন্দরী গাছ হারিয়ে যাওয়া কেবল একটি পরিবেশগত ক্ষতি নয়, এটি বনের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর এক বিশাল আঘাত। একইভাবে গোলপাতার মতো গাছগুলোও উপকূলীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।’

শাকবাড়িয়া নদীর তীরের এক ছোট চা দোকানে বসে অলস সময় পার করছিলেন স্থানীয় মৌয়ালরা। সকালের বৃষ্টির পর আকাশে মেঘ জমে আছে।

সুরঞ্জনের কাকা চপল রাপ্তানও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এই মৌসুমে কেমন মধু সংগ্রহ হলো—জানতে চাইলে তিনি মাথা নেড়ে আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, ‘এখন বাইন ফুলের সময়। অথচ এ বছর একটা বাইন গাছেও ফুল ফোটেনি। কোনো বাইন মধু পাওয়া যায়নি।’

দোকানে উপস্থিত অন্য মৌয়ালরাও সায় দিয়ে বলেন, ‘আমাদের পুরা জীবনে আমরা এমন ঘটনা কখনো দেখিনি। একটা গাছেও ফুল নেই।’

লবণাক্ততার সরাসরি প্রভাবে আকন্দ, বাসক, হরীতকী, অশ্বগন্ধা, নিম কিংবা ‘মহা সমুদ্র’-র মতো ঐতিহ্যবাহী ওষুধি গাছ লোকালয় ও বন থেকে দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

কয়রার মঠবাড়িয়া এলাকায় থাকেন ৬৫ বছর বয়সী কবিরাজ প্রভাত সরদার। ৩৫ বছর ধরে তিনি এই পেশায় যুক্ত। কর্দমাক্ত রাস্তা পেরিয়ে তাঁর ছোট ইটের তৈরি ঘরে গিয়ে দেখা গেল, বারান্দায় বসে শুকনো ওষুধি পাতার ব্যাগ খুলছেন তিনি।

খুব সাবধানে কাগজের পুটলিগুলো খুলে প্রভাত সরদার বলেন, ‘আমার দাদা বসন্ত কবিরাজ আমাকে ১৫ বছর বয়সে সাপের কামড়ের চিকিৎসা শিখিয়েছিলেন। কিন্তু আমিই হয়তো শেষ। এখন আর কোনো তরুণ এই বিদ্যা শিখতে চায় না।’

তিনি জানান, আগে তাঁর কাছে যত রকমের ভেষজ উপাদান ছিল, এখন তার তিন ভাগের এক ভাগও নেই। অনেক দূর থেকে বা নার্সারি থেকে চড়া দামে এসব সংগ্রহ করতে হয়।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সরদার নাসির উদ্দিন বিষয়টিকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে উল্লেখ করেন। নিজের পারিবারিক স্মৃতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার দাদুও বরগুনায় কবিরাজ ছিলেন। ছোটবেলায় দেখতাম উঠানে মানুষ গিজগিজ করত। কিন্তু আমার বাবা আর এই পেশায় আসেননি। এখন আমাদের বাড়ির উঠানে আগে যে তুলসী বা বাসক গাছ দেখা যেত, তা আধুনিক ওষুধের সহজলভ্যতার কারণে মানুষ আর চাষ করে না।’

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘সুন্দরবন ভেষজ উদ্ভিদের এক অপার ভান্ডার। কিন্তু আধুনিক গবেষণার মাধ্যমে নথিভুক্ত করার আগেই এগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি কবিরাজের প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গে যেন একেকটি লাইব্রেরি পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।’

জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএফসিসিসি)-র মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই হয় না, বরং স্থানীয় জ্ঞান, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জীববৈচিত্র্যের মতো ‘অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি’ ঘটে, যা কোনো অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়।

নিজের জরাজীর্ণ উঠানে প্লাস্টিকের টবে কিছু চারাগাছ বাঁচিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন সুরঞ্জন রাপ্তান। ২০০০ লিটারের একটি পানির ট্যাংকে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে সেই স্বাদু পানি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছেন কয়েক জাতের ভেষজ চারা।

একটি তুলসী গাছের পাতা আঙুলে ডলে ঘ্রাণ নিয়ে সুরঞ্জন বললেন, ‘লবণাক্ত মাটির কারণে গাছের সুবাস এবং ভেষজ গুণাগুণ অনেকটাই কমে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও চেষ্টা করছি চারাগুলো বাঁচিয়ে রাখতে।’

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আমার বাবার আমলে এলাকায় ৮-১০ জন কবিরাজ ছিলেন। এখন হয়তো আমরা মাত্র ২-৩ জন বেঁচে আছি। আমাদের পর এই বিদ্যা নেওয়ার আর কেউ নেই। আমরাই শেষ প্রজন্ম।’

প্রভাত সরদারও বিষণ্ন কণ্ঠে একই আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেন, ‘আমি হয়তো একদিন মারা যাব, কিংবা হাঁটতে পারব না। গাছগুলোও নোনা জলে মরে যাবে। মানুষ ক্লিনিকে যাবে, ওষুধ কিনবে, আর ভুলেই যাবে যে থানকুনি বা বাসক নামে কোনো পাতা দিয়েও রোগ নিরাময় হতো। মানুষ যে তাদের স্মৃতি আর ইতিহাস ভুলে যাচ্ছে—এটাই সবচেয়ে বড় কষ্টের!’

বৃষ্টি নামলে সুরঞ্জন তাঁর প্লাস্টিকের টবের চারাটির গোড়ায় ভেজা মাটি আলতো করে চেপে দেন। বৃষ্টি বাড়তে থাকে, আর তার সঙ্গেই যেন অনিশ্চয়তার মেঘ আরও ঘন হয়ে নেমে আসে সুন্দরবনের প্রান্তে টিকে থাকা প্রাচীন এই লোকজ বিদ্যার ওপর।

ঢাকার সকাল শুরু হলো ঝুম বৃষ্টিতে। এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরও পূর্বাভাসে জানিয়েছে, আজ ঢাকায় বৃষ্টির দেখা মিলতে পারে। আজ রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ৭টা থেকে পরবর্তী ৬ ঘণ্টার ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার আবহাওয়া পূর্বাভাসে এ কথা জানানো হয়েছে।

রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় আজ শনিবার অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণ হতে পারে।

ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের দুর্গম জাগরোস পর্বতমালায় এমন এক বিরল সাপের দেখা মেলে, যার লেজের ডগা দেখতে অবিকল মাকড়সার মতো। সাপের এমন বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিন ধরেই বিস্মিত করেছে। এবার এক্স-রে প্রযুক্তিতে সাপটির লেজের ভেতরের গঠন পরীক্ষা করে গবেষকেরা আরও চমকপ্রদ তথ্য পেলেন।

জনপ্রিয় টার্গেট

নিখোঁজের তিন দিন পর খালে মিলল শিশুর লাশ, পুলিশ বলছে হত্যা

বিলুপ্তির পথে সুন্দরবনের ভেষজ ভান্ডার, হারিয়ে যাচ্ছে বংশানুক্রমিক কবিরাজি বিদ্যা

প্রকাশ: ১২:১২:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভোরের বিষণ্ন আলোয় নদীর তীরে কাদা-জল পেরিয়ে নিজের কাকার বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়ালেন চল্লিশ বছর বয়সী সুরঞ্জন রাপ্তান।

‘কাকা, বাড়ি আছেন?’ বাইরে থেকে হাঁক দিলেন সুরঞ্জন।

ঘর থেকে বের হয়ে এলেন মাঝারি গড়নের পেটানো চেহারার মৌয়াল চপল রাপ্তান। কিছুটা বসে যাওয়া গলায় উত্তর দিলেন, ‘সুরঞ্জন? আয়, বোস। গতকাল বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করেছি, খুব সর্দি-কাশি হয়েছে। তাই একটু জিরাচ্ছি।’

সুরঞ্জন উত্তর দিলেন, ‘খারাপ খবর। তুলসী পাতা আর মধু দিয়ে গরম চা খাও, আরাম পাবে। আমি এখন বসব না কাকা, বনে যাব কিছু গাছগাছড়া সংগ্রহ করতে। তোমার নৌকাটা একটু নেব।’

কাকা নৌকার খোঁজ জানিয়ে দিলে সুরঞ্জন হাঁটা দিলেন নদীর ঘাটে। ‘ঠিক আছে কাকা, বিশ্রাম নাও। শরীর বেশি খারাপ লাগলে আমি ওষুধ পাঠিয়ে দেব’, পরামর্শ দেন তিনি।

এই নদীর ওপারেই বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, যা সুরঞ্জনের জীবনের সিংহভাগ জুড়ে একটি বিশাল প্রাকৃতিক ফার্মেসি বা ওষুধ ভান্ডার হিসেবে কাজ করে আসছে।

নদীতে উল্টে রাখা ছোট নৌকাটি সোজা করে পানিতে ভাসালেন সুরঞ্জন। তীরের কাদায় তাঁর পা অনেকটাই দেবে যাচ্ছিল। নৌকায় উঠে ঝুলন্ত পা দুটো নদীর জলে ধুয়ে তিনি এগোতে থাকলেন সুন্দরবনের দিকে।

বনের সীমানায় পা রাখতেই নোনা জল আর কাদার পরিচিত গন্ধ ভেসে আসে। চারদিকে ম্যানগ্রোভ গাছের শ্বাসমূলগুলো কাঁকড়ার বাঁকা চিমটার মতো মাটি ফুঁড়ে উঠে আছে। মাছরাঙার তীক্ষ্ণ ডাক, পোকামাকড়ের ভ্যানভ্যানানি আর বাতাসে পাতার মর্মর শব্দ। খালি পায়ে হাঁটছেন সুরঞ্জন। তাঁর মতে, খালি পায়ে হাঁটলে মাটির স্পর্শ পাওয়া যায় এবং নিঃশব্দে চলাফেরা করা যায়; জুতা পরলে কাদায় পা পিছলে যাওয়ার ভয় থাকে।

এক জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে কাদায় ছোট একটি গর্ত দেখিয়ে সুরঞ্জন বললেন, ‘এইমাত্র একটা হরিণ এখান দিয়ে হেঁটে গেছে।’

একটু এগিয়ে একটি গুল্মজাতীয় গাছের পাতা স্পর্শ করে বললেন, ‘পেট ব্যথা হলে এই পাতা পানিতে ফুটিয়ে খেতে হয়।’

তার কয়েক পা দূরে একটি উঁচু গাছের ছাল স্পর্শ করে বললেন, ‘এই ছাল চেঁচে পানির সঙ্গে মিশিয়ে খেলে পুরোনো কাশি দূর হয়।’

এরপর তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন একটি প্রবীণ সুন্দরী গাছের সামনে। ডিম্বাকৃতির গাঢ় সবুজ পাতার দিকে তাকিয়ে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘এই গাছটার নামানুসারেই এই বনের নাম হয়েছিল সুন্দরবন। কিন্তু এখন এই সুন্দরী গাছ বুনো এলাকায় বিরল হয়ে উঠেছে। আজ এখানে এটা দেখতে পাওয়া আমাদের ভাগ্য।’

সুরঞ্জনের মতে, ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’র পর থেকে বনের চেহারা দ্রুত বদলাতে শুরু করে। ‘আইলার আগে বন এত ঘন ছিল যে ভেতরে সূর্যের আলো পৌঁছাত না। কিন্তু তারপর থেকে বন পাতলা হতে শুরু করে। এখন বনের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে’, বলেন সুরঞ্জন।

২০১৫ বা ২০১৬ সালের পর থেকে পরিবর্তনটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেসব জায়গায় আগে ঘন ছায়া থাকত, সেখানে রোদ পড়তে শুরু করে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে চেনা ওষুধি গাছগুলো বন থেকে একে একে উধাও হতে শুরু করে।

সুরঞ্জন রাপ্তান ২১ বছর ধরে কবিরাজি করছেন। এই বিদ্যা তিনি শিখেছেন তাঁর বাবার কাছ থেকে, আর তাঁর বাবা শিখেছিলেন দাদার কাছ থেকে। এই বিদ্যা কোনো বই-পুস্তকে লেখা ছিল না। কোন গাছ চিনতে হবে, কোথায় তা পাওয়া যাবে, গাছের কোন অংশ কখন তুলতে হবে এবং কীভাবে ওষুধ তৈরি করতে হবে—সবই অর্জিত হয়েছে মুখের কথায়, চর্চায় এবং স্মৃতিতে।

কয়রার নিজ বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে নদীর ওপারে সুন্দরবনের সবুজ চাদর দেখা যায়। সুরঞ্জন স্মৃতিচারণ করে বলেন, বিশ বছর আগে তাঁর বাড়ির উঠানে প্রতিদিন দূর-দুরান্ত থেকে বহু রোগী এসে ভিড় করতেন। নারী, পুরুষ, শিশুদের নিয়ে মায়েরা আসতেন। জ্বর, সর্দি-কাশি, পেটের পীড়া বা শরীর ব্যথার চিকিৎসার জন্য তাঁর শরণাপন্ন হতেন সবাই। অনেকে আবার জঙ্গল থেকে তুলে আনা পাতার পুঁটলি নিয়ে আসতেন গাছ চিনে নেওয়ার জন্য।

কিন্তু গত এক দশকে এই ভিড় অনেকটাই পাতলা হয়ে এসেছে।

একদিকে বন থেকে ওষুধি গাছ হারিয়ে যাওয়া, অন্যদিকে গ্রামে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার প্রসার। ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় ‘কমিউনিটি ক্লিনিক’ কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করে। বর্তমানে দেশজুড়ে প্রায় ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক কাজ করছে, যার মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের অনেকে হাতের নাগালে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধ পাচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় ফার্মেসিগুলোতে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই সহজে ওষুধ কেনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ফলে নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে কবিরাজদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তবে এখনো যারা কবিরাজদের কাছে আসেন, তাদের প্রধান কারণ দারিদ্র্য ও শহরের চড়া চিকিৎসা খরচ।

সুরঞ্জনের বাড়ির থেকে তিন বাড়ি দূরে থাকেন ৩২ বছর বয়সী দীপা মণ্ডল। বারান্দায় বসে স্বামী ও ছয় বছরের সন্তানকে নিয়ে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন তিনি।

দীপা বলেন, ‘বাড়িতে কারও জ্বর, সর্দি, কাশি বা মেয়েদের কোনো শারীরিক সমস্যা হলে আমি প্রথমেই সুরঞ্জন দার কাছে যাই। তিনি ভেষজ তৈরি করে দেন।’

দীপার স্বামীর হেপাটাইটিস-বি রোগ রয়েছে। জন্ডিস বা শারীরিক দুর্বলতা কমাতে তাঁরা স্থানীয় ভেষজ ওষুধি বড়ি ব্যবহার করেন। সেগুলো সুরঞ্জন রাপ্তান তৈরি করে দেন।

খালি পায়ে গোলাপি শাড়ি পরা দীপা ছেলেকে ভাত খাওয়াতে খাওয়াতে বলেন, ‘শহরের ডাক্তারের কাছে যাওয়ার মতো টাকা আমাদের নেই। শহরের ক্লিনিক অনেক দূরে, ওষুধ আর যাতায়াত খরচ অনেক বেশি। কিন্তু সুরঞ্জন দা চিকিৎসা বা ওষুধের জন্য কোনো দিন এক টাকাও নেন না।’

কয়রা এলাকায় প্রাইভেট ডাক্তারের চেম্বারে দেখাতে গেলে পরামর্শ ফি বাবদ ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ হয়, যা স্থানীয় দরিদ্র মানুষের জন্য বিশাল বোঝা।

একই সড়কের খানিকটা দূরে ৮০ বছর বয়সী শুভদ্রা মণ্ডল শেষ বিকেলে নিজের ছাগলগুলোকে সামলাচ্ছিলেন। বাত ও হাঁটুর ব্যথায় ভোগা এই বৃদ্ধা বলেন, ‘আমার ভাগনে সুরঞ্জনের কাছ থেকে আমি ভেষজ ওষুধ নিই। গাছগাছড়ার ছাল-পাতা মধুর সঙ্গে মিশিয়ে বানিয়ে দেয়। খেলে ব্যথার কিছুটা উপশম হয়। শহরে ডাক্তার দেখাতে গেলে অনেক টাকা চায়। ছেলে বনে মাছ ধরে সংসার চালায়, অত টাকা আমরা পাব কোথায়!’

উপকূলীয় এই অঞ্চলে শুধু চিকিৎসায় নয়, সুপেয় পানির ক্ষেত্রেও নোনা জলের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে চললেও শুষ্ক মৌসুমে খাওয়ার পানির জন্য স্থানীয় মানুষদের দিনে ৪ কিলোমিটার পথ হেঁটে পুকুর থেকে পানি এনে রান্না ও পানের কাজ চালাতে হয়।

১০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে প্রায় ২৭ লাখ মানুষ বসবাস করেন। শত শত বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষ বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বারবার আঘাত হানা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের ফলে বনের পানিতে লবণাক্ততা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে নদীর পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ ২১ থেকে বেড়ে ৩৩ পার্টস পার থাউজেন্ডে (ppt) পৌঁছেছে। একই সময়ে উপকূলের মাটিতে লবণাক্ততা বেড়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিকস অ্যান্ড প্ল্যান্ট ব্রিডিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রহিম বলেন, ‘লবণাক্ততা বনের উদ্ভিদ কূলের ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। নোনা জল সহ্য করতে পারা প্রজাতিগুলো টিকে থাকলেও, সুরঞ্জনদের মতো কবিরাজরা যেসব অত্যন্ত সংবেদনশীল ওষুধি গাছের ওপর নির্ভর করতেন, সেগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সুন্দরী গাছ হারিয়ে যাওয়া কেবল একটি পরিবেশগত ক্ষতি নয়, এটি বনের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর এক বিশাল আঘাত। একইভাবে গোলপাতার মতো গাছগুলোও উপকূলীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।’

শাকবাড়িয়া নদীর তীরের এক ছোট চা দোকানে বসে অলস সময় পার করছিলেন স্থানীয় মৌয়ালরা। সকালের বৃষ্টির পর আকাশে মেঘ জমে আছে।

সুরঞ্জনের কাকা চপল রাপ্তানও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এই মৌসুমে কেমন মধু সংগ্রহ হলো—জানতে চাইলে তিনি মাথা নেড়ে আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, ‘এখন বাইন ফুলের সময়। অথচ এ বছর একটা বাইন গাছেও ফুল ফোটেনি। কোনো বাইন মধু পাওয়া যায়নি।’

দোকানে উপস্থিত অন্য মৌয়ালরাও সায় দিয়ে বলেন, ‘আমাদের পুরা জীবনে আমরা এমন ঘটনা কখনো দেখিনি। একটা গাছেও ফুল নেই।’

লবণাক্ততার সরাসরি প্রভাবে আকন্দ, বাসক, হরীতকী, অশ্বগন্ধা, নিম কিংবা ‘মহা সমুদ্র’-র মতো ঐতিহ্যবাহী ওষুধি গাছ লোকালয় ও বন থেকে দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

কয়রার মঠবাড়িয়া এলাকায় থাকেন ৬৫ বছর বয়সী কবিরাজ প্রভাত সরদার। ৩৫ বছর ধরে তিনি এই পেশায় যুক্ত। কর্দমাক্ত রাস্তা পেরিয়ে তাঁর ছোট ইটের তৈরি ঘরে গিয়ে দেখা গেল, বারান্দায় বসে শুকনো ওষুধি পাতার ব্যাগ খুলছেন তিনি।

খুব সাবধানে কাগজের পুটলিগুলো খুলে প্রভাত সরদার বলেন, ‘আমার দাদা বসন্ত কবিরাজ আমাকে ১৫ বছর বয়সে সাপের কামড়ের চিকিৎসা শিখিয়েছিলেন। কিন্তু আমিই হয়তো শেষ। এখন আর কোনো তরুণ এই বিদ্যা শিখতে চায় না।’

তিনি জানান, আগে তাঁর কাছে যত রকমের ভেষজ উপাদান ছিল, এখন তার তিন ভাগের এক ভাগও নেই। অনেক দূর থেকে বা নার্সারি থেকে চড়া দামে এসব সংগ্রহ করতে হয়।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়ামের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সরদার নাসির উদ্দিন বিষয়টিকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে উল্লেখ করেন। নিজের পারিবারিক স্মৃতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার দাদুও বরগুনায় কবিরাজ ছিলেন। ছোটবেলায় দেখতাম উঠানে মানুষ গিজগিজ করত। কিন্তু আমার বাবা আর এই পেশায় আসেননি। এখন আমাদের বাড়ির উঠানে আগে যে তুলসী বা বাসক গাছ দেখা যেত, তা আধুনিক ওষুধের সহজলভ্যতার কারণে মানুষ আর চাষ করে না।’

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘সুন্দরবন ভেষজ উদ্ভিদের এক অপার ভান্ডার। কিন্তু আধুনিক গবেষণার মাধ্যমে নথিভুক্ত করার আগেই এগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি কবিরাজের প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গে যেন একেকটি লাইব্রেরি পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।’

জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএফসিসিসি)-র মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই হয় না, বরং স্থানীয় জ্ঞান, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জীববৈচিত্র্যের মতো ‘অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি’ ঘটে, যা কোনো অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়।

নিজের জরাজীর্ণ উঠানে প্লাস্টিকের টবে কিছু চারাগাছ বাঁচিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন সুরঞ্জন রাপ্তান। ২০০০ লিটারের একটি পানির ট্যাংকে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে সেই স্বাদু পানি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছেন কয়েক জাতের ভেষজ চারা।

একটি তুলসী গাছের পাতা আঙুলে ডলে ঘ্রাণ নিয়ে সুরঞ্জন বললেন, ‘লবণাক্ত মাটির কারণে গাছের সুবাস এবং ভেষজ গুণাগুণ অনেকটাই কমে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও চেষ্টা করছি চারাগুলো বাঁচিয়ে রাখতে।’

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আমার বাবার আমলে এলাকায় ৮-১০ জন কবিরাজ ছিলেন। এখন হয়তো আমরা মাত্র ২-৩ জন বেঁচে আছি। আমাদের পর এই বিদ্যা নেওয়ার আর কেউ নেই। আমরাই শেষ প্রজন্ম।’

প্রভাত সরদারও বিষণ্ন কণ্ঠে একই আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেন, ‘আমি হয়তো একদিন মারা যাব, কিংবা হাঁটতে পারব না। গাছগুলোও নোনা জলে মরে যাবে। মানুষ ক্লিনিকে যাবে, ওষুধ কিনবে, আর ভুলেই যাবে যে থানকুনি বা বাসক নামে কোনো পাতা দিয়েও রোগ নিরাময় হতো। মানুষ যে তাদের স্মৃতি আর ইতিহাস ভুলে যাচ্ছে—এটাই সবচেয়ে বড় কষ্টের!’

বৃষ্টি নামলে সুরঞ্জন তাঁর প্লাস্টিকের টবের চারাটির গোড়ায় ভেজা মাটি আলতো করে চেপে দেন। বৃষ্টি বাড়তে থাকে, আর তার সঙ্গেই যেন অনিশ্চয়তার মেঘ আরও ঘন হয়ে নেমে আসে সুন্দরবনের প্রান্তে টিকে থাকা প্রাচীন এই লোকজ বিদ্যার ওপর।

ঢাকার সকাল শুরু হলো ঝুম বৃষ্টিতে। এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরও পূর্বাভাসে জানিয়েছে, আজ ঢাকায় বৃষ্টির দেখা মিলতে পারে। আজ রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ৭টা থেকে পরবর্তী ৬ ঘণ্টার ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার আবহাওয়া পূর্বাভাসে এ কথা জানানো হয়েছে।

রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় আজ শনিবার অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণ হতে পারে।

ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের দুর্গম জাগরোস পর্বতমালায় এমন এক বিরল সাপের দেখা মেলে, যার লেজের ডগা দেখতে অবিকল মাকড়সার মতো। সাপের এমন বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিন ধরেই বিস্মিত করেছে। এবার এক্স-রে প্রযুক্তিতে সাপটির লেজের ভেতরের গঠন পরীক্ষা করে গবেষকেরা আরও চমকপ্রদ তথ্য পেলেন।