খুলনার কয়রা উপজেলায় গভীর রাতে ঘরের বেড়া কেটে ভেতরে ঢুকে এক ওষুধ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় এলাকায় চরম আতঙ্ক ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে। নিহত শ্রী ভবতোষ মৃধা খোকা (৪৫) স্থানীয়ভাবে পরিচিত একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। রবিবার দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের গিলাবাড়ি গ্রামে এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে।
নিহত ভবতোষ মৃধা গিলাবাড়ি বাজারে অবস্থিত ‘অনূষ্কা ফার্মেসি’র স্বত্বাধিকারী ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এলাকায় ওষুধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং স্থানীয়দের কাছে একজন শান্ত স্বভাবের মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। হঠাৎ এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাত গভীর হলে দুর্বৃত্তরা বাড়ির পেছনের অংশ দিয়ে এসে ঘরের বেড়ার নিচের মাটি সরিয়ে সিঁধ কাটে। পরে তারা নিঃশব্দে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় পরিবারের সদস্যরা কিছুটা শব্দ টের পেয়ে জেগে ওঠেন। কিন্তু তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে ভবতোষ মৃধার ওপর হামলা চালায়। এলোপাতাড়ি কুপিয়ে তাকে গুরুতর আহত করা হয়।
স্বামীকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে হামলাকারীরা নিহতের স্ত্রী বিভা মৃধাকেও কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। পরে দুর্বৃত্তরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। আহতদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে রক্তাক্ত অবস্থায় ভবতোষ মৃধা ও তার স্ত্রীকে উদ্ধার করেন।
স্থানীয়রা প্রথমে তাদের কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ভবতোষ মৃধাকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত স্ত্রী বিভা মৃধাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
নিহতের স্ত্রী বিভা মৃধা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “দুই-তিন দিন আগেও চোরেরা আমাদের বাড়ির আশপাশে ঘোরাফেরা করেছিল। আমরা ভয়ে ছিলাম। গতরাতেও হঠাৎ শব্দ পেয়ে বুঝতে পারি কেউ বাড়িতে ঢুকেছে। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা আমার স্বামীকে কুপাতে শুরু করে। আমি বাধা দিতে গেলে আমাকেও আঘাত করে।”
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ওই এলাকায় চুরি ও ডাকাতির ঘটনা বেড়ে গেছে। কয়েক দিন ধরেই রাতে অপরিচিত লোকজনের চলাচল নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। তবে এত বড় হত্যাকাণ্ড ঘটবে তা কেউ কল্পনাও করেনি। তারা দ্রুত ঘটনার রহস্য উদঘাটন ও জড়িতদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন।
কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. সুজিত কুমার বৈদ্য জানান, “রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে গুরুতর আহত অবস্থায় ভবতোষ মৃধাকে হাসপাতালে আনা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যায়, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। তার শরীরে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল।”
ঘটনার খবর পেয়ে কয়রা থানা পুলিশ রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পুলিশ সদস্যরা বাড়ির বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন। পরে মরদেহের সুরতহাল তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
কয়রা থানার তদন্ত ওসি শাহ আলম বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে চুরি কিংবা ডাকাতির উদ্দেশ্যে দুর্বৃত্তরা ঘরে ঢুকেছিল। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যক্তিগত শত্রুতা বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে পুলিশ কাজ শুরু করেছে।”
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করতে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এদিকে ভবতোষ মৃধার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সকাল থেকেই তার বাড়িতে ভিড় করেন আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। অনেকেই এ ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলেও এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় টহল বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
নিহত ভবতোষ মৃধার পরিবার এখন গভীর শোক ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহল এ ঘটনার দ্রুত বিচার দাবি করেছেন।
ঘটনার পর পুরো গিলাবাড়ি গ্রামে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই রাত জেগে পাহারা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। এলাকাবাসীর আশা, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে রহস্য উদঘাটন করে জড়িতদের গ্রেফতার করা হবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

শেখ সিরাজউদ্দৌলা লিংকন 
























