প্রশ্ন হচ্ছে, গ্লোবাল সাউথের এই উত্থান কি সত্যিই নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা করছে, নাকি এটি কেবল ক্ষমতার পুরোনো প্রতিযোগিতায় নতুন পক্ষের আবির্ভাব? বাস্তবতা হলো, বিশ্ব এখনো পশ্চিমা আধিপত্যমুক্ত কোনো নতুন ব্যবস্থায় প্রবেশ করেনি। বরং উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে দর-কষাকষির জায়গা তৈরি করছে। ফলে বর্তমান পরিবর্তনকে পশ্চিমা আধিপত্যের তাৎক্ষণিক অবসান না বলে বৈশ্বিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসংগত।
গ্লোবাল সাউথের উত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায় ব্রিকসের সম্প্রসারণে। এখানেই গ্লোবাল সাউথের উত্থানের একটি বড় বৈপরীত্য সামনে আসে। একই জোটে অন্তর্ভুক্ত হলেই রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ এক হয়ে যায় না। চীন ও ভারতের মধ্যে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সংঘাত জোটের সব সদস্যের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। বরং ভিন্ন স্বার্থসম্পন্ন দেশগুলোর একটি বিস্তৃত পরিসর, যেখানে প্রত্যেকেই নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়। আন্তর্জাতিক সংকটগুলোতেও এই স্বতন্ত্র অবস্থান প্রতিফলিত হচ্ছে।
ভবিষ্যতের ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্যনিরাপত্তা এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করতে না পারলে উন্নয়নশীল দেশগুলো নতুন ধরনের নির্ভরতার মুখে পড়বে। ভারতের ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। নিজস্ব ডিজিটাল পরিচয়, অর্থ লেনদেন ও তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশটি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য দেশও পারস্পরিক অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে এ ধরনের সক্ষমতা তৈরি করতে পারে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন নতুন বৈষম্য, নজরদারি বা তথ্যের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তৈরি না করে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকা জরুরি।
কিন্তু এই দাবি বাস্তবে কতটা প্রতিষ্ঠিত হবে, তা নির্ভর করবে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো নিজেদের মধ্যে কতটা কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তুলতে পারে তার ওপর। নতুন কোনো পরাশক্তির অধীনে পুরোনো নির্ভরতার পুনরাবৃত্তি নয়, বরং ন্যায়সংগত, অংশগ্রহণমূলক ও বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত তাদের লক্ষ্য। বাংলাদেশের জন্যও এই পরিবর্তন একটি সুযোগ, তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে কেবল কূটনৈতিক ভারসাম্য নয়, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। কারণ, বিশ্বব্যবস্থার নিয়ম বদলানোর দাবি তোলার আগে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা জরুরি। শেষ পর্যন্ত বিশ্বক্ষমতার পালাবদলে কারা এগিয়ে থাকবে, তা শুধু তাদের অর্থনৈতিক আকার দিয়ে নির্ধারিত হবে না; নির্ধারিত হবে কারা নিজেদের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা রাখে।

দৈনিক টার্গেট 

























