আদালতের রায়ে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন শাহাদাত হোসেন। কিন্তু মেয়র পদে তাঁর মেয়াদ শেষ হয় আট মাস আগে। তখন এ নিয়ে সমালোচনার জবাবে শাহাদাত হোসেন আদালতের আদেশের কথা উল্লেখ করে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তাঁর মেয়াদ থাকার দাবি করেছিলেন।
এই বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘আট মাসে উনি যেসব দায়িত্ব পালন করেছেন, সেগুলোর কী হবে, সেটা সময়ই বলবে।’
চসিক সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ষষ্ঠ পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়েছে আট মাস আগে। সেই হিসাবে এই পরিষদের কর্তা সিটি মেয়র ও বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেনের মেয়াদও শেষ হওয়ার কথা।
নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় চসিকের ষষ্ঠ পরিষদের নির্বাচন। ওই নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১৯ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৬ জন। নির্বাচনে ভোট পড়ে ২২ দশমিক ৫২ শতাংশ। নির্বাচনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শাহাদাত ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট পান। তবে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী মো. রেজাউল করিম চৌধুরী ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৪৮ ভোট পান বলে জানানো হয়। একই বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি শপথ এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ষষ্ঠ পরিষদের প্রথম সভা হয়েছে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। এই কারণে ওই পরিষদের মেয়াদ শেষ হয় গত ২২ ফেব্রুয়ারি।
এদিকে একটি সূত্র জানায়, গত মার্চেও শাহাদাত হোসেনকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগের প্রস্তাব তৈরি করেছিল স্থানীয় সরকার বিভাগ। তখন আদেশ জারি করা হয়নি।
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ধারা ৬ অনুযায়ী, কোনো সিটি করপোরেশনের মেয়াদ প্রথম সভার তারিখ থেকে পাঁচ বছর। আবার ২০১১ সালের ১ ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনের সংশোধিত ৬ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, মেয়াদ শেষে পরিষদ বিলুপ্ত হবে, জনপ্রতিনিধির পদে থাকার সুযোগ থাকবে না; সে অনুযায়ী চসিকের ষষ্ঠ পরিষদের মেয়াদ ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে।
এদিকে ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ২৮ দিন পর ২৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন শাহাদাত হোসেন। তিনি মামলা করেন নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচারক খাইরুল আমীনের আদালতে। ওই মামলায় তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা, তৎকালীন চসিক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীসহ ৯ জনকে বিবাদী করা হয়। অন্য বিবাদীদের মধ্যে ছিলেন চসিক নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা (আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা) মো. হাসানুজ্জামান এবং অন্য মেয়র প্রার্থীরা।
পরে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে করা এই মামলায় নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল এবং চট্টগ্রামের ১ম যুগ্ম জেলা জজ ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর রায় দেন। ওই রায়ে ‘নৌকা’ প্রতীকের প্রার্থীর বিজয় বাতিল করে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থী শাহাদাত হোসেনকে নির্বাচিত মেয়র ঘোষণা করা হয়।
২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করে শাহাদাতকে চসিকের মেয়র হিসেবে ঘোষণা করে। একই বছরের ৩ নভেম্বর শপথ গ্রহণের মাধ্যমে মেয়রের দায়িত্ব নেন তিনি।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী শাহাদাত ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী মেয়র হিসেবে ৫ বছরের জন্য মনোনীত হয়েছেন, আদেশটি ২০২৪ সালে হলেও তাঁর মেয়াদ ওই নির্বাচনে বিজয়ী হিসেবে ৫ বছর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে। শাহাদাত হোসেনকে মেয়র ঘোষণার যে গেজেট প্রকাশ করা হয়, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সেটি ছিল সংশোধিত গেজেট; স্বতন্ত্র কোনো গেজেট নয়। গেজেটের মূলকথা ছিল, মেয়র হিসেবে রেজাউল করিম চৌধুরীর জায়গায় প্রতিস্থাপিত হবে শাহাদাত হোসেনের নাম। গেজেটে মেয়াদের কোনো কথা বলা হয়নি।
মেয়াদ শেষ হওয়া নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সাবেক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আদালতের আদেশ অনুসারে আমি চাইলে ২০২৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে পারি। আর আমি মেয়র না থাকলে করপোরেশন চালাবে কে?’
এদিকে মেয়াদ শেষের আট মাসে নগরীতে পরিচালিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের আইনি বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। তবে তাঁর কাজ নিয়ে প্রশংসা করেন দলীয় লোকজন।
চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের সহসভাপতি শাহেদ আকবর বলেন, ‘শাহাদাত ভাই কাজের মানুষ। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন নগরীতে।’
তবে চসিক প্রশাসক হিসেবে ডা. শাহাদাত হোসেনকে নিয়োগ করায় সরকারের বিরুদ্ধে মামলা হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিন। গতকাল নগরের চকবাজারে আলী প্লাজায় চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন।
আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, সাবেক মেয়রের মেয়াদ এরই মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ একজন ব্যক্তিকে পুনরায় চসিকের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি, অযৌক্তিক এবং জন-আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী। এমন অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের জন্য সরকারের বিরুদ্ধে মামলা হওয়া উচিত। তিনি অবিলম্বে বিতর্কিত এই নিয়োগ বাতিল করে নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় প্রশাসক নিয়োগের দাবি জানান।
এই বিষয়ে জামায়াতে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী শামসুজ্জামান হেলালি বলেন, ‘গত ২২ ফেব্রুয়ারির পর তিনি (শাহাদাত) যা বেতন-ভাতা নিয়েছেন, সেগুলোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এত দিন তিনি বলতেন, তিনি নাকি আদালতের মাধ্যমে ২০২৯ সাল পর্যন্ত মেয়র। এখন মেয়াদ উত্তীর্ণ হিসেবে তাঁকে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে।’

দৈনিক টার্গেট 
























