১৮ অক্টোবর প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অবকাঠামো সরিয়ে বিআরটিকে ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এ জন্য করিডরে নির্মিত ২৫টি স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করা হবে। এতে ব্যয় হবে ৪৫ কোটি টাকা। সড়কটি প্রশস্ত করতে চাওয়া হয়েছে আরও ২৭ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১২ সালে একনেকে অনুমোদনের সময় বিমানবন্দর-গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৬ সালে। তিন দফা সংশোধনের পর ব্যয় দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকায়। ২০২৫ সালে চতুর্থ দফায় চাওয়া ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রস্তাব অন্তর্বর্তী সরকারের একনেক ফিরিয়ে দেয়। ইতিমধ্যে খরচ হয়ে গেছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা, অথচ একটি বিশেষ বাসও রাস্তায় নামেনি।
প্রকল্পটি চলছিল মূলত বিদেশি ঋণে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অনুমোদিত ঋণ ২৬ কোটি ডলার এবং ফরাসি উন্নয়ন সংস্থার ঋণ ৪ কোটি ইউরো। প্রকল্প বাতিল হলেও ছাড় করা ঋণ সুদসহ শোধ করতে হবে।
গাজীপুর নগরীর বাসিন্দা বুরহান উদ্দিন অরণ্য বলেন, ‘নিজের পকেটের টাকা খরচ করার সময় পায় পায় করে সবাই হিসাবনিকাশ করে। আর এগুলো তো জনগণের টাকা; এ জন্য হিসাবনিকাশ পরিকল্পনা নেই। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করার পর এখন আবার ভাঙতে হবে। সেখানেও কোটি কোটি টাকা ব্যয় হবে। এগুলো কার টাকা?’
গাজীপুরের পরিবেশকর্মী সাঈদ চৌধুরী বলেন, ‘প্রকল্পটি নিয়ে আমাদের প্রত্যাশার জায়গা ছিল অনেক। জ্যাম কমা, ভোগান্তি দূরসহ নানা বিষয়। যেহেতু সরকার মনে করছে এটি নতুনভাবে করতে হবে, তাই বলতে চাই যতটা সম্ভব অপচয় কমানো, বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ করা ও মেট্রো রেলের জায়গা ঠিক করে কাজ এগিয়ে নেওয়া। পাশাপাশি আর যেন ভোগান্তি না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা।’
দেশের উত্তরবঙ্গের ২৩টি জেলা এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহের ৭টি জেলাসহ মোট ৩০টি জেলার মানুষের রাজধানীতে যাতায়াতের প্রধান প্রবেশদ্বার গাজীপুর। গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত মহাসড়কটি ১২ কিলোমিটার অংশ ছিল সরু ও অপরিকল্পিত। ফুটওভার ব্রিজ না থাকা, কাঁচাবাজার, বাস স্টপেজ, আবর্জনার স্তূপ এবং অবৈধ যানবাহনের দাপটে এই সড়কে প্রতিদিন যানজট লেগে থাকত। এসব সমস্যা দূরীকরণে নেওয়া হয় বিআরটি প্রকল্পটি।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প শুরুর পরই প্রকাশ পায় এর সঠিক নকশা ও পর্যাপ্ত সমীক্ষার অভাব। মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করলেও সড়কে জলাবদ্ধতা নিরসনে পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। সেবা সংস্থার বিভিন্ন লাইন সরানোর পরিকল্পনা ছিল না। ব্যস্ত এই মহাসড়কে নির্মাণ চলাকালে বিকল্প যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয়নি এবং ছিল না স্ট্রিট লাইট ও ফুটপাত। ফলে ধীরগতি, ভূমি অধিগ্রহণ ও নকশা পরিবর্তনের জটিলতায় জড়িয়ে নির্ধারিত সময়ের অনেক পর, ২০১৮ সালে মাঠপর্যায়ে বড় আকারের নির্মাণকাজ শুরু হয়।
প্রকল্প চালুর সময় যাত্রী সাধারণকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে বিআরটি চালু হলে চান্দনা চৌরাস্তা থেকে মাত্র ৩০ মিনিটে বিমানবন্দর পৌঁছানো সম্ভব হবে এবং প্রতি ঘণ্টায় ২০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারবে। পরিকল্পনা ছিল, সড়কের মাঝখানে তৈরি পৃথক লেন দিয়ে চলবে বিশেষ বিআরটি বাস। এতে সাধারণ যানবাহনের জটলা ছাড়া স্বাচ্ছন্দ্যে যাত্রীরা পৌঁছাতে পারবেন। অথচ ইতিমধ্যে খরচ হয়ে গেছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা, কিন্তু একটি বিশেষ বাসও রাস্তায় নামেনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে ১৫টি স্টেশন অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। তবে কোনো স্টেশনের কাজই পুরোপুরি শেষ হয়নি। যাত্রীদের ওঠানামার জন্য নির্মিত কয়েকটি পদচারী-সেতুতে চলন্ত সিঁড়ি ও লিফট রয়েছে। কিন্তু এসব স্থাপনা এখন ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরেছে, কোথাও অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে।
গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির জামাল উদ্দিন বলেন, ‘সরকার এটা অদূরদর্শিতার পরিচয় দেবে, কারণ অনেক টাকা ইনভেস্ট করা হয়েছে। তাই এটিকে আরও কীভাবে উন্নত করা যায় সে চিন্তা করতে হবে। একটি প্রকল্পকে বাস্তবায়ন না করে আবার আরেকটা করা এটা কল্যাণকর হবে না।’
জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার শিশির বলেন, ‘জনগণের রাজস্ব অপচয় করে শেষ মুহূর্তে এসে বিআরটি প্রকল্প বন্ধ ও ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত হতাশাজনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। অপরিকল্পিত পরিকল্পনা, লাগামহীন দুর্নীতি এবং জবাবদিহিবিহীন মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের এই চরম মাশুল শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণকেই দিতে হচ্ছে। কেবল প্রকল্প ভেঙে ফেললেই দায় শেষ হয়ে যায় না। এর ব্যর্থতার পেছনের অদক্ষতা ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোর আইনি জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার বলেন, ‘বর্তমান সরকার বাস্তবসম্মত একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই বিআরটি প্রকল্প ফ্যাসিস্ট সরকারের লুটপাটের একটি খাত ছিল, যা সাধারণ মানুষের গলার কাঁটা হয়ে রয়েছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে গাজীপুর অংশে চলাচলকারী মানুষ প্রায় ১৪ বছর ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে স্বস্তি ফিরে আসবে গাজীপুর দিয়ে চলাচলকারী বাস ও যাত্রীদের।’
গাজীপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত লিখিত কোনো চিঠি পাইনি। বিভিন্ন সংবাদপত্রে দেখেছি। অফিশিয়ালি চিঠি পেলে বুঝতে পারব কী করতে হবে। আমাদের যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হবে আমরা সেভাবেই কার্যক্রম করব।’

দৈনিক টার্গেট 



















