সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বাম দলগুলোর বিরুদ্ধে সনাতন ধর্মের অবমাননার অভিযোগ তুলে বলেছেন, দুর্গাপূজার মণ্ডপের পাশে বামেদের বইয়ের স্টল বসাতে হলে ‘শারদোৎসব’ লেখা যাবে না, লিখতে হবে ‘দুর্গাপূজা’। এমনকি ‘শারদোৎসব’ লেখা থাকলে স্টল করতে না দেওয়ার জন্য পূজা কমিটিগুলোকে অনুরোধও করেছেন।
অর্থাৎ এত দিন পূজামণ্ডপে ফুল, ধূপ, প্রদীপ, প্রার্থনা, বই, গান ও আড্ডা ছিল। এখন তার সঙ্গে যোগ হতে পারে শব্দের পাহারাও। স্টল বসানোর আগে ব্যানার দেখাতে হবে। কী লেখা আছে? ‘শারদোৎসব’। না, চলবে না। কেটে লিখুন, ‘দুর্গাপূজা’। তারপর অনুমতি মিলবে।
বিষয়টি আপাতত তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু তুচ্ছতার আড়ালেই বড় রাজনৈতিক বিপদ লুকিয়ে থাকে। প্রশ্নটি ‘দুর্গাপূজা’ না ‘শারদোৎসব’, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, একটি উৎসবের নাম নির্ধারণের অধিকার কে পাবে? কোনো রাজনৈতিক নেতা? কোনো দল? কোনো পূজা কমিটি? নাকি একটি সমাজের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা?
ধর্মীয় উৎসবের ধর্মীয় পরিচয় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গাপূজা হিন্দুদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব, এ সত্য অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু একটি ধর্মীয় উৎসব যখন মানুষের সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে ওঠে, তখন তার পরিসর কি শুধু ধর্মীয় আচারে আটকে থাকে? ঈদ কি শুধু নামাজ? বড়দিন কি শুধু গির্জার প্রার্থনা? বুদ্ধপূর্ণিমা কি শুধু ধর্মীয় আচার? পয়লা বৈশাখ কি শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ?
উৎসব ধর্ম থেকে জন্ম নিতে পারে, কিন্তু সমাজে এসে তার অর্থ ও পরিসর বিস্তৃত হয়। সেখানে যুক্ত হয় গান, সাহিত্য, নাটক, শিল্প, খাবার, পোশাক, মেলা, বন্ধুত্ব, স্মৃতি ও মানুষের অবাধ মেলামেশা। ধর্মীয় আচার তার একটি অংশ, পুরো উৎসব নয়।
এই জায়গাতেই রবীন্দ্রনাথের ‘শারদোৎসব’ আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন রেখে যায়। তিনি ‘দুর্গাপূজা’ নামে নাটক লেখেননি। লিখেছেন ‘শারদোৎসব’। নাটকের শুরুতেই শিশুরা গায়, ‘মেঘের কোলে রোদ উঠেছে, বাদল গেছে টুটি, আজ আমাদের ছুটি ও ভাই, আজ আমাদের ছুটি।’
রবীন্দ্রনাথ কি দুর্গাপূজার ধর্মীয় পরিচয় জানতেন না? নিশ্চয়ই জানতেন। কিন্তু তিনি উৎসবকে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখেননি। শরৎ, প্রকৃতি, শিশু, গান, আনন্দ ও মানুষের মিলনকে একসঙ্গে দেখেছেন। সেই বৃহত্তর পরিসরের নাম দিয়েছেন ‘শারদোৎসব’।
১০০ বছরের বেশি সময় পর সেই শব্দ যদি ধর্ম অবমাননার প্রতীক হয়ে ওঠে, তাহলে সমস্যা শব্দটির মধ্যে নয়। সমস্যা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে। সংকীর্ণতার সমস্যা হলো, তার কোনো স্বাভাবিক সীমা নেই। মানুষকে একবার পরিচয়ের খোপে ঢোকানোর অভ্যাস তৈরি হলে পরের ধাপ হয় পোশাক, তারপর গান, তারপর বই, তারপর বন্ধুত্ব। শেষ পর্যন্ত মানুষ অন্যের আনন্দে অংশ নেওয়ার আগেও ভাবতে বাধ্য হয়, কেউ তাকে দেখে ফেলছে কি না। এটি ধর্মের সুরক্ষা নয়। এটি সামাজিক আস্থার সংকট।
রবীন্দ্রনাথের লক্ষেশ্বর হয়তো বলতেন, ‘ছেলেদের গান বন্ধ করো।’ আধুনিক লক্ষেশ্বর বলেন, ‘গান গাও, তবে আমার অনুমোদিত শব্দ ব্যবহার করে।’ এখানেই বিপদ। কারণ, এটি শুধু আনন্দ নিয়ন্ত্রণ নয়, ভাষা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা।
এভাবে সমাজ বড় হয় না, ছোট হয়। উৎসবের আসল শক্তি এখানেই যে এটি ধর্মীয় পরিচয়ের সীমানা পেরিয়ে মানুষের মধ্যে একটি বৃহত্তর ‘আমরা’ তৈরি করতে পারে। একজন পূজা করবেন, অন্যজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাবেন, কেউ বই কিনবেন, কেউ গান শুনবেন, কেউ শুধু আলো দেখবেন। কে কতটুকু ধর্মীয় আচারে অংশ নেবেন, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। অন্যের আনন্দের জায়গায় দাঁড়ানোর জন্য ধর্মীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
ধর্মকে রক্ষা করার সবচেয়ে খারাপ পদ্ধতি হলো তাকে ভয় দেখানো। বই দিয়ে ভয়, গান দিয়ে ভয়, শব্দ দিয়ে ভয়, অন্যের উপস্থিতি দিয়ে ভয়। এতে ধর্ম শক্তিশালী হয় না, বরং তাকে দুর্বল ও অনিরাপদ দেখায়।
আমাদের সময়ের সংকট হয়তো ধর্মের অভাব নয়, উদারতার অভাব। আমরা নিজের বিশ্বাস নিয়ে দাঁড়াতে চাই, কিন্তু অন্যের বিশ্বাসের পাশে দাঁড়াতে চাই না। নিজের উৎসবকে পবিত্র বলি, কিন্তু অন্যের উৎসবের সামাজিক বিস্তার দেখলেই সন্দেহ করি। নিজের সংস্কৃতি রক্ষা করতে চাই, কিন্তু সংস্কৃতির স্বাভাবিক মেলামেশাকেই ভয় পাই। এই মানসিকতা শেষ পর্যন্ত ধর্মকেও রক্ষা করে না, সংস্কৃতিকেও নয়। শুধু সমাজের পরিসর সংকুচিত করে।
তাই শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের প্রকৃত বিতর্ক ‘দুর্গাপূজা’ বনাম ‘শারদোৎসব’ নয়। বিতর্কটি হলো, একটি উৎসবের অর্থ কে ঠিক করবে? ক্ষমতা? রাজনৈতিক দল? কোনো নেতা? নাকি সেই সমাজ, যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উৎসবকে নিজের জীবনযাত্রার অংশ করে নিয়েছে?
আমরা যদি প্রতিটি উৎসবের পাশে একজন করে শব্দ পরিদর্শক বসাই, তাহলে হয়তো বানান ঠিক থাকবে, কিন্তু উৎসবের প্রাণটাই হারিয়ে যাবে। আজ ‘শারদোৎসব’ সন্দেহজনক। কাল অন্য কোনো শব্দ হবে। আজ বইয়ের ব্যানার পরীক্ষা হচ্ছে। কাল বই পরীক্ষা হবে। আজ উৎসবের নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কাল উৎসবে যাওয়ার অধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
তারপর একদিন হয়তো সবই থাকবে। মণ্ডপ থাকবে, আলো থাকবে, মাইক থাকবে, ব্যানার থাকবে, রাজনৈতিক বক্তৃতা থাকবে। শুধু মানুষ থাকবে না, আনন্দও থাকবে না।
লক্ষেশ্বর তখন নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট হবেন। হিসাবের খাতা ঠিক থাকবে। শুধু জীবনের হিসাবটি মিলবে না।
শেষ পর্যন্ত শরৎ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। কাশফুল কোনো দলের নয়। শিউলি কোনো মতাদর্শের নয়। গান কোনো ধর্মের একার নয়। আর আনন্দকে যদি পরিচয়পত্র দেখিয়ে উৎসবে ঢুকতে হয়, তাহলে সেটি আর উৎসব থাকে না।
রবীন্দ্রনাথের ‘শারদোৎসব’ আজ তাই শুধু একটি নাটকের নাম নয়, এটি একটি রাজনৈতিক প্রশ্নও। আমরা কি উৎসবকে মানুষের দিকে খুলে দেব, নাকি পরিচয়ের তালা লাগিয়ে দেব?
আমাদের এই সমাজেই একশ্রেণির মানুষ আছে, যারা বছরের পর বছর নীরবে কাজ করে চলে। তাদের শ্রমে-ঘামে আমাদের দেশের অর্থনীতি চলে, আমাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা হয়। কিন্তু তাদের দুঃখ দেখার কেউ নেই। তারা সংঘটিত নয়, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সারা বাংলার গ্রামেগঞ্জে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে।
আপনি নানা ধরনের অন্যায় করবেন কিন্তু সে অপরাধের জন্য কোনো সাজা হবে না, এটা নিশ্চিত করতে হলে আপনাকে সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। নানা সময় সরকারি দলের নানা লোক এই ‘অধিকার’ ভোগ করে এসেছেন, তাই নতুন বিএনপি সরকারে এ রকম নেতা পাওয়া যাবে না—তা কি হয়?
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলোচনা হলেই হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসকের সংখ্যা, ওষুধের দাম কিংবা যন্ত্রপাতির সংকট সামনে আসে। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থার সবচেয়ে মৌলিক, অথচ তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত ভিত্তি হলো রোগ নির্ণয় বা পরীক্ষাগার সেবা।
দৈনিক টার্গেট 





















