আসন্ন অর্থবছরের রাজস্ব নীতিতে দেশের উৎপাদনশীল খাতকে আরও শক্তিশালী করতে এবং নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে একগুচ্ছ কর ও শুল্ক সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বাজারে কিছু পণ্যের দাম কমতে পারে, আবার কিছু আমদানিনির্ভর ও বিলাসী পণ্যের ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, স্থানীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিতে বিভিন্ন খাতে কর ছাড় ও ভ্যাট কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদনকে সুরক্ষা দিতে কিছু বিদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি করা হতে পারে।
ইলেকট্রনিক পণ্যে স্বস্তি আসতে পারে
দেশে উৎপাদিত টেলিভিশন, ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার ও অন্যান্য গৃহস্থালি ইলেকট্রনিক পণ্যের ওপর ভ্যাটের হার কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি এসব শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতেও কর সুবিধা দেওয়া হতে পারে। ফলে স্থানীয়ভাবে তৈরি ইলেকট্রনিক পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কমে বাজারমূল্য হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ওষুধ ও চিকিৎসাসেবায় ব্যয় কমার আশা
ক্যান্সার চিকিৎসার কয়েকটি ওষুধ, হৃদরোগে ব্যবহৃত রিং এবং চোখের লেন্স আমদানিতে কর ছাড় দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। এছাড়া কিডনি ডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত ফিল্টারের ওপর বিদ্যমান আগাম কর প্রত্যাহার হলে চিকিৎসা ব্যয়ও কমতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে এ ধরনের সুবিধা রোগীদের জন্য স্বস্তির কারণ হতে পারে।
কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব
ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, চিনি, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎসে কর কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে সরবরাহব্যবস্থায় ব্যয় কমে বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে আমদানিকৃত শিশুখাদ্যের ক্ষেত্রেও কর রেয়াতের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রযুক্তিপণ্যে কর সুবিধা
দেশীয় প্রযুক্তি শিল্পকে উৎসাহ দিতে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মনিটর ও মোবাইল ফোন উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানিতে কর কমানো হতে পারে। ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত প্রযুক্তিপণ্যের দাম ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে আসতে পারে।
স্বর্ণের বাজারেও আসতে পারে পরিবর্তন
স্বর্ণ বিক্রির ক্ষেত্রে বর্তমান ভ্যাট ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে নির্দিষ্ট হারে কর নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে উৎসে কর ও টার্নওভার কর কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে অলঙ্কার শিল্পে ব্যবসায়িক ব্যয় হ্রাস পাবে। এর প্রভাব স্বর্ণালঙ্কারের খুচরা মূল্যেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনে উৎসাহ
সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম, পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি কর সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি হাইব্রিড ও ইলেকট্রিক গাড়ির কিছু কর কমানো হলে এ খাতের বাজার আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য সুখবর
ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতাদের ওপর বিদ্যমান ভ্যাট ও আয়কর প্রত্যাহারের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে অনলাইনভিত্তিক সৃজনশীল পেশাজীবীরা সরাসরি আর্থিক সুবিধা পাবেন।
যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে
অন্যদিকে, দেশীয় উৎপাদকদের সুরক্ষার লক্ষ্যে কিছু আমদানিনির্ভর পণ্যের ওপর কর ও শুল্ক বাড়ানোর চিন্তা করা হচ্ছে। এর মধ্যে কাজুবাদাম, কিছু মাছ, বিদেশি প্রসাধনী, বিলাসপণ্য এবং উচ্চমূল্যের খাদ্যপণ্য রয়েছে।
তামাকজাত পণ্যের ওপরও নতুন কর আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে সিগারেট, জর্দা ও গুলের দাম বাড়তে পারে। একইভাবে দেশি-বিদেশি মদের ওপর বাড়তি কর আরোপ করা হলে এসব পণ্যের মূল্যও বৃদ্ধি পাবে।
এ ছাড়া ইস্পাতজাত পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে কর বৃদ্ধির কারণে নির্মাণ খাতে ব্যবহৃত রডের দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রস্তাবিত কর-শুল্ক সংস্কার বাস্তবায়িত হলে একদিকে স্থানীয় শিল্প ও বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে, অন্যদিকে কিছু ভোগ্যপণ্যের দাম কমে সাধারণ ভোক্তার ব্যয়ও হ্রাস পেতে পারে। তবে বিলাসী ও আমদানিনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি বাজারে নতুন সমন্বয় তৈরি করবে।















Leave a Reply