চলমান বিশ্বপরিস্থিতিতে সিরীয় প্রেসিডেন্টের শেষোক্ত এ বক্তব্য শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয়, এটি এমন ন্যায্য অভিমত যে তা শুধু গোলান মালভূমির ওপর তার জনগণের অধিকার সংরক্ষণের জন্যই নয়, পৃথিবীর যেকোনো রাষ্ট্রের যেকোনো ভূমির ওপর অন্যের অবৈধ দখলদারত্ব প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবং এ প্রসঙ্গে গোলান মালভূমির পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালিত অন্য আরও কিছু দখলদারত্ব উদ্যোগের বিষয়ও এখানে উত্থাপন করা প্রাসঙ্গিক হবে বলে মনে করি। এর মধ্যকার প্রথমটি হচ্ছে গ্রিনল্যান্ড। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমেই যেসব ঘোষণা দিলেন তার মধ্যে একটি হচ্ছে, ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখল করে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা। অথচ ডেনমার্ক তাদের দীর্ঘকালের পরীক্ষিত মিত্র, তদুপরি তারা একই রক্ত-বংশের পূর্বসূরি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গ নাগরিকদের (আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ান বা অন্যরা নন) পূর্বপুরুষেরা ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীরই অংশ, যাঁরা দণ্ড পালনের জন্য ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে সেখানে নির্বাসিত হয়েছিলেন। ফলে পূর্বপুরুষের রক্তের টানের কারণেও ইউরোপের প্রতি এক বিশেষ ধরনের মমতা যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের বরাবরই ছিল। এবং সত্যি কথা বলতে কি, পুঁজিতান্ত্রিক স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি অনেকটা সে মমতা থেকেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরে ১৯৪৯ সালে আটলান্টিকের পূর্ব ও পশ্চিমপারের ১২ দেশ মিলে উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা বা ন্যাটো গঠন করে, যার প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে ডেনমার্কও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতের সমুদয় বন্ধন ও সম্পর্ককে অস্বীকার করে এবং সামরিক জোটগত সম্পর্কের বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে বংশীয় মিত্র ডেনমার্কেরই অংশবিশেষ দখল করে নিতে উদ্যোগী হলেন।
এটি কি বিশ্বাসঘাতকতা, আত্মপরিচয় বিসর্জন, নাকি দণ্ডভোগকারী পূর্বপুরুষীয় চরিত্রের পুনরুত্থান, সে বিচার আগামী দিনের ইতিহাস করবে।
ট্রাম্প দখল করে নিতে চাচ্ছেন হরমুজ প্রণালিসহ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সব তেলক্ষেত্রও। সে লক্ষ্যে তিনি শুধু ইরানে আক্রমণ চালিয়ে বা সে দেশের ধর্মীয় নেতাকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হননি, হরমুজ প্রণালিকে ‘ট্রাম্প প্রণালি’ নামেও আখ্যায়িত করেছেন। শিগগিরই কিউবা আক্রমণের জন্য মার্কিন সেনাবাহিনী প্রস্তুত হচ্ছে বলেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সূত্রে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মোটকথা, আগ্রাসন ও দখলদারত্বই যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনের মূল বৈশিষ্ট্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তরকালে যার প্রথম বড় যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৭ সালে ইসরায়েলকে দিয়ে জর্ডান নদীর পশ্চিম তীর ও গাজা দখলের মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বস্তুত এটিই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড়, ঘৃণ্য ও জঘন্য দখলদারত্বের ঘটনা, যা এখনো বহাল আছে। আর এ দখলদারত্ব টিকিয়ে রাখতে পারার সাহস ও সামর্থ্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েই বস্তুত পরবর্তীকালে পৃথিবীর অন্যত্র একের পর এক নানা দখলদারত্বের ঘটনা ঘটতে থাকে, যেগুলোর সঙ্গে ক্রমান্বয়ে গোলান মালভূমি ও অন্যান্য এলাকা যুক্ত হতে থাকে। আর সহসা এসব দখলদারত্বের অবসান হওয়ার কোনো লক্ষ্মণও চোখে পড়ছে না।
এ অবস্থায় সিরীয় প্রেসিডেন্ট যে বললেন, গোলান মালভূমি কেবল সিরিয়ার জনগণের এবং ওই ভূখণ্ড অন্য কাউকে দিয়ে দেওয়ার অধিকার কোনো প্রেসিডেন্টের নেই—সেটির এবং সেই সঙ্গে অপরাপর দখলদারত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কী? এ সূত্রে কূটনৈতিক কৌশলী কায়দাকানুন ও বুদ্ধিবৃত্তিক মারপ্যাঁচ বাদ দিয়ে সরাসরি কিছু প্রস্তাব এখানে তুলে ধরা হলো, যা বিদ্যমান দখলদারত্ব থেকে বিশ্বকে বহুলাংশে মুক্ত করার পাশাপাশি নতুন দখলদারত্বের সম্প্রসারণ থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে কিছুটা হলেও সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়। প্রস্তাবগুলো হচ্ছে:
এক. ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের গত ৭৭ বছরের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা ও মূল্যায়নপূর্বক যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোর উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে এ সময়ের মধ্যে তারা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। তাদের টেকসই নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আসলে তেমন কিছুই করেনি। এমনকি নিজ গোষ্ঠীভুক্ত সদস্যদেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালাতেও তার বাধছে না, যেটি গ্রিনল্যান্ড দখলের পাঁয়তারার মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে। এমতাবস্থায় ইউরোপের এ দেশগুলো ন্যাটোতেই থাকবে, নাকি ন্যাটো থেকে বেরিয়ে গিয়ে ইউরোপের নিজস্ব স্বাধীন নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলবে, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করার সময় এসেছে।
তিন. লাতিন আমেরিকার দেশগুলো মার্কিন সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে বরাবরই যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে। এরপরও মানতেই হবে যে ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া-উত্তর পরিস্থিতিতে তাদের শক্তি কিছুটা হলেও হ্রাস পেয়েছে। এমতাবস্থায় পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতিতে তাদের আরও ঐক্যবদ্ধ ও সাহসী হয়ে ওঠার কোনো বিকল্প নেই। নইলে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনবাদী সরকার ২০২৬-এর জানুয়ারিতে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে উঠিয়ে নিয়ে আসার মাধ্যমে যে আগ্রাসন শুরু করেছে, আগামী ডিসেম্বরে তা যে কিউবার ওপর পড়বে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়?
চার. গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি নির্মাণের ক্ষেত্রে অত্যধিক পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর অনেক রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিই এখন ক্ষমতায় যাওয়া বা টিকে থাকার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়ে বসে আছে, যা তাদের নিকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমস্যায় ফেলতে পারে। এ অবস্থায় এ দেশগুলোর জনগণের উচিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গড়ে ওঠা এ ধরনের সার্বভৌমত্ব বিসর্জনমূলক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে নিজেদের সরকারগুলোকে বাধ্য করা।
পাঁচ. যেসব আগ্রাসী ও স্বেচ্ছাচারিতাপূর্ণ নীতির কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন ক্রমেই অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে, চীন, জাপান ও ভারতের মতো নতুন উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর উচিত সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে নিকট ভবিষ্যতের দিনগুলোতে যেকোনো ধরনের আগ্রাসন ও স্বেচ্ছাচারিতা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখা। নইলে তাদের পরিণতিও আবার একসময় যুক্তরাষ্ট্রের মতোই হতে পারে।
সিরীয় প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সঙ্গে কণ্ঠ মেলাতে হয়—প্রতিটি রাষ্ট্রের প্রতি বর্গইঞ্চি জমির মালিক সে দেশের জনগণ। অতএব, সেই জনগণকে না জানিয়ে এক বর্গইঞ্চি পরিমাণ জমিও অন্য কাউকে দিয়ে দেওয়ার বা তা দখল করে নেওয়ার অধিকার ট্রাম্প, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কারোরই নেই। তা সত্ত্বেও যে ১৯৬৭ সাল থেকে গাজা ও পশ্চিম তীর এবং গোলান মালভূমি মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় ইসরায়েলিরা দখল করে রেখেছে কিংবা যুক্তরাষ্ট্র যে এখন গ্রিনল্যান্ড বা হরমুজ প্রণালি দখল করে নিতে চায়, তা স্পষ্টতই মানবতাবিরোধী অগণতান্ত্রিক আগ্রাসন। সারা বিশ্বের শান্তিকামী জনগণের উচিত হবে এসব আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা ও সেসব আগ্রাসনকে নিজেদের সর্বশক্তি দিয়ে রুখে দাঁড়ানো। এবং সে প্রতিরোধসংগ্রামে বাংলাদেশের জনগণের অংশগ্রহণও জরুরি বলে মনে করি।

দৈনিক টার্গেট 


























