রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে নিরীহ বাঙালি

  • দৈনিক টার্গেট
  • প্রকাশ: ০৮:২১:২২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
  • ৭ বার পঠিত হয়েছে

দেশের এই অস্থির সময়ে কত ধরনের ঘটনা ঘটছে, তা নিশ্চয়ই সচেতন মানুষেরা খেয়াল করছেন। এই অবস্থা থেকে আদতে কীভাবে মুক্তি আসতে পারে, তা নিয়েও হয়তো ভাবছেন। কত দ্রুত মববাজি আর মাস্তানির অবসান ঘটবে, তা নিয়ে তারপরও মানুষের সংশয় কাটছে না। এরই মধ্যে দেশের বাইরে থেকে এমন একটি খবর এসেছে, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমাদের দেশের মানুষ ভাগ্যের চাকা ঘোরাবার আশায় বহু টাকা খরচ করে বিদেশে যাচ্ছেন, কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁদের পরিণতি কী হচ্ছে, তা নিয়েই এই খবর। খবরটির উৎসভূমি রাশিয়া।

বাংলাদেশসহ আরও কয়েকটি দেশের মানুষকে বেসামরিক চাকরি দেওয়ার কথা বলে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাঁদের কাউকে কাউকে একটি রাশিয়ান ভাষায় লেখা চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ ফ্রন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। চুক্তিপত্রে কী লেখা আছে, সেটা এই চাকরিপ্রত্যাশীরা বোঝেন না। কারণ, রাশিয়ান ভাষা তাঁদের জানা নেই। কিন্তু যখন স্বল্প সময়ের প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের ফ্রন্টে যেতে বাধ্য করা হয়, তখনই বুঝতে পারেন যে তাঁরা প্রতারিত হয়েছেন। আর কখনো কখনো সেই প্রতারণার শেষ হয় মৃত্যুর মাধ্যমে। সেই মৃত্যু এক- একটি পরিবারকে আক্ষরিক অর্থেই অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেয়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়ে উঠেছিল হাজারটা স্বপ্ন নিয়ে। রুশ বিপ্লবের মূল নায়ক ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন প্রায় অসাধ্য সাধন করেছিলেন। মার্ক্সের তত্ত্ব অনুযায়ী সবচেয়ে এগিয়ে থাকা পুঁজিবাদের দেশেই বিপ্লব হওয়ার কথা। কিন্তু লেনিন ও তাঁর বলশেভিক দল রাশিয়ার মতো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা একটি দেশে বিপ্লব সাধন করে ফেললেন। নির্যাতিত মানুষ আশায় বুক বাঁধলেন, এবার সাম্য আসবে।

যদিও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সবার জন্য কর্মসংস্থান ইত্যাদি ব্যাপারে সোভিয়েত ইউনিয়ন সাফল্য দেখিয়েছিল, কিন্তু কোনোভাবেই সে রাষ্ট্র জনগণের রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারেনি। পার্টির মধ্যেই আমলাতন্ত্র শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। ঘুষ-দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি সবকিছুই ছিল বর্তমান। পার্টি নেতাদের লাগামহীন ক্ষমতা এবং সে ক্ষমতার অপব্যবহার সবই ছিল। সে আলোচনা এখানে না করলেও হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা ‘ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ’ বইটি পড়ে দেখতে পারেন। সেখানে এই পতনের কার্যকারণগুলো খুবই সঠিকভাবে বিবৃত হয়েছে।

সেই স্বপ্নের দেশটির পতন হয়েছিল বাইরের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে নিজের স্বৈরাচারী মনোবৃত্তির যোগফলে। এরপর সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের মাধ্যমে সেই দেশ থেকে বেরিয়ে ১৫টি স্বাধীন গণতান্ত্রিক আলাদা রাষ্ট্র যখন গড়ে উঠল, তখন পশ্চিম ইউরোপীয় ধাঁচে পূর্ব ইউরোপ ও মধ্যএশিয়ার দেশগুলোর জীবনযাত্রা গড়ে উঠবে, এ রকম একটি আশা জেগে উঠেছিল কারও কারও মনে। কিন্তু গণতন্ত্রের নামে যেভাবে এই দেশগুলোয় লুণ্ঠন চলেছে, যেভাবে অলিগার্করা লুটেপুটে খেয়েছে দেশগুলো, তাতে সেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে এই রুশ ফেডারেশন, ইউক্রেনসহ নতুন দেশগুলোর মিল খুঁজে পাওয়া নিতান্তই কষ্টকল্পনা। এখনকার রাশিয়া যেকোনো পুঁজিবাদী দেশের মতোই জনগণকে শোষণ করে টিকে আছে। দেশটি নিজেকে পুঁজিবাদী দেশ বলেই মনে করে থাকে। হারানো পরাক্রমশালী দেশের তকমা আবার পাওয়ার জন্য আগ্রহী।

আমাদের আজকের বিষয়বস্তুর মধ্যে সরাসরি না ঢুকে কেন ধান ভানতে শিবের গীত গাইলাম, তার ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। বিদেশে যারা লোক পাঠায়, তাদের দুরভিসন্ধি আজকের নয়। আদম ব্যবসার নামে এই অসাধু মানুষেরা নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয় আর নির্দয়ভাবে ভাগ্যবদলপ্রত্যাশী মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। ইতালিতে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব মানুষকে কীভাবে আদম ব্যবসায়ীরা ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে দিগন্তহীন দরিয়ায় নৌকায় তুলে দেয় এবং সে নৌকায় ভাসতে ভাসতে নানা কারণেই যাত্রীরা মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন কিংবা কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন, সে বার্তাও এখন কারও কাছে অজানা নয়। মালয়েশিয়ায় আদম ব্যবসার শিকার মানুষের জীবন কতটা বিপজ্জনক, সে কথা কে না জানে।

মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে এক পর্যটনকেন্দ্রের ওপরে পাহাড়ের মধ্যে একজন বাঙালি বাগান পরিচর্যাকারীকে দেখেছিলাম, যার কোনো কাগজপত্র ছিল না। এখানে কাজ করছেন কোনো চুক্তি ছাড়াই। প্রায় ক্রীতদাসের মতোই সেখানে থাকতে হচ্ছে তাঁকে। সামান্য অর্থে নিজের জীবনটা যাপন করে যাচ্ছেন। পাহাড়ের ওপর পুলিশ আসে না বলে রক্ষে। বাড়িতেও টাকা পাঠাতে পারছেন না।

সৌদি আরবে গৃহভৃত্যদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এখন আর নতুন নয়। এই ভয়াবহ ঘটনাগুলো ঘটান অভিজাত সম্প্রদায়ের মানুষেরা। এ ছাড়া এক কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও অন্য কাজ করতে বাধ্য করা, চুক্তি মোতাবেক টাকা না দেওয়া, ভুয়া ভিসা তৈরি করা, পাসপোর্ট আটকে রাখাসহ কত ধরনের অনিয়মই না করা হচ্ছে। কিন্তু এই মানুষের সুরক্ষিত রাখার কথা যাঁদের, তাঁরা আসলে কী করেন? নাকে তেল দিয়ে ঘুমানোর জন্যই কি তাঁদের দূতাবাসে চাকরি দেওয়া হয়?

আমাদের দেশের অসৎ মানুষেরা তো বটেই, অন্য যেসব দেশে মানব পাচার হয়, সেসব দেশের অসৎ মানুষের সহযোগিতা ছাড়া এই অপকর্ম করা সম্ভব হতো না। সরকারি কর্তৃপক্ষের কেউ কেউ এই অসৎ কাজে যুক্ত থাকে। এসব এতটাই ওপেন সিক্রেট যে কেউই তাতে আর বিস্মিত হয় না। এই দুষ্টচক্রটি ভাঙতে হলে সরকারের যেমন সদিচ্ছা থাকা দরকার, তেমনি ভাগ্য পরিবর্তনপ্রত্যাশী মানুষদেরও সচেতন হওয়া দরকার।

মানুষ কেন এই ফাঁদে পা দিচ্ছে? প্রথমেই বলতে হবে, বেকারত্বের গ্লানি সইতে না পেরে অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমাতে চান। একটু সুখের মুখ দেখবেন বলে জমানো টাকা, জমি বিক্রি করে তা দালালের হাতে দিয়ে দেন। দালালেরাও তখন এমন আশ্বাস দিয়ে থাকে যে ওই দেশে গিয়ে হাজির হলেই থোকা থোকা টাকা এসে পকেটে জমা হবে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে রাশিয়ায় যেকোনো কাজে যোগ দেওয়ার জন্য মনস্থির করে মানুষ। এরপর অতিরিক্ত বেতনের প্রলোভন। যে অঙ্কটি বলা হয়, তার সঙ্গে মূল বেতনের কোনো সামঞ্জস্য থাকে না। দালালেরা চেনাজানা মানুষ হয়ে থাকে। পরিচিত ব্যক্তি, আত্মীয়, কথিত বৈধ নিয়োগ সংস্থা, ভিসা ও বিমান টিকিট—সব মিলিয়ে প্রতারণাকে প্রকৃত চাকরির সুযোগ বলে মনে হতে পারে।

চুক্তির ব্যাপারে যে স্বচ্ছতা থাকে না, সেটা তো দেখাই যাচ্ছে। রাশিয়া কেন বিভিন্ন দেশ থেকে দালালদের মাধ্যমে লোক সংগ্রহ করছে, এ রকম প্রশ্নের উত্তর সবাই জানে। আমাদের মনে পড়ে যাবে, আফগানিস্তানের সরকারকে সমর্থন দিতে ১৯৭৯ সালে যে সোভিয়েত সেনারা সে দেশটায় গিয়েছিল, তাঁদের অনেকেই ফিরে এসেছিলেন লাশ হয়ে। প্রায় ১০ বছরব্যাপী সোভিয়েত সেনাদের আফগানিস্তানে অবস্থান স্বভাবতই কমিউনিস্ট সরকারের জনপ্রিয়তা কমিয়েছিল। সে কথা বিবেচনা করেই কি নিজেদের সেনাদের সুরক্ষিত রেখে বাইরের দেশের মানুষকে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে? এই অসহায় মানুষের কেউ কি সেনা হিসেবে যুদ্ধ করতে যাওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে?

রাশিয়া আর ইউক্রেন যুদ্ধ করবে আর সেখানে কোনো কারণ ছাড়াই মৃত্যুবরণ করবেন আমাদের দেশের মানুষ, এটা মেনে নেওয়া যায় না। যা যা অবশ্যকরণীয়, তার কিছু এখানে বলছি।

এক. বাংলাদেশি দালাল, রিক্রুটিং এজেন্সি, বিদেশি মধ্যস্থতাকারী, অর্থ লেনদেন এবং ভিসা ব্যবস্থার যোগসূত্র অনুসন্ধান করতে হবে।

তিন. বিদেশে আটকেপড়া কর্মীদের উদ্ধার: দূতাবাস, কনস্যুলার সহায়তা ও প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করতে হবে।

চার. প্রতারিত পরিবারের মামলা পরিচালনা, উদ্ধার ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

আর সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো বিদেশে যাওয়ার আগেই চাকরির চুক্তি, নিয়োগকর্তা, ভিসার ধরন, কাজের স্থান এবং সামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক আছে কি না—এসব যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা করতে হবে।

সরকার যেন এসব ব্যাপারে নাকে তেল দিয়ে না ঘুমায়, তার ব্যবস্থাও করতে হবে।

জেলেদের সঙ্গে প্রতারণা

জেলেদের সঙ্গে প্রতারণা

মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ সময় জেলেরা যাতে জীবিকার সংকটে না পড়েন, সে জন্য সরকার প্রতি জেলেকে ২৫ কেজি করে বিনা মূল্যে চাল বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার সময় পেরিয়ে গেলেও পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার রণগোপালদী ও দশমিনা ইউনিয়নের কোনো জেলেই চাল পাননি।

বাড়ছে উচ্চশিক্ষিত বেকার, করণীয় কী

বাড়ছে উচ্চশিক্ষিত বেকার, করণীয় কী

দেশে শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের উচ্চ হার নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সনদ হাতে নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তাঁরা বুঝতে পারেন শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই চাকরি মেলে না।

জনপ্রিয় টার্গেট

রাজধানীর রামপুরা ব্রিজে দুই বাসের প্রতিযোগিতায় চাপা পড়ে পথচারীর মৃত্যু

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে নিরীহ বাঙালি

প্রকাশ: ০৮:২১:২২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

দেশের এই অস্থির সময়ে কত ধরনের ঘটনা ঘটছে, তা নিশ্চয়ই সচেতন মানুষেরা খেয়াল করছেন। এই অবস্থা থেকে আদতে কীভাবে মুক্তি আসতে পারে, তা নিয়েও হয়তো ভাবছেন। কত দ্রুত মববাজি আর মাস্তানির অবসান ঘটবে, তা নিয়ে তারপরও মানুষের সংশয় কাটছে না। এরই মধ্যে দেশের বাইরে থেকে এমন একটি খবর এসেছে, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমাদের দেশের মানুষ ভাগ্যের চাকা ঘোরাবার আশায় বহু টাকা খরচ করে বিদেশে যাচ্ছেন, কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁদের পরিণতি কী হচ্ছে, তা নিয়েই এই খবর। খবরটির উৎসভূমি রাশিয়া।

বাংলাদেশসহ আরও কয়েকটি দেশের মানুষকে বেসামরিক চাকরি দেওয়ার কথা বলে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাঁদের কাউকে কাউকে একটি রাশিয়ান ভাষায় লেখা চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ ফ্রন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। চুক্তিপত্রে কী লেখা আছে, সেটা এই চাকরিপ্রত্যাশীরা বোঝেন না। কারণ, রাশিয়ান ভাষা তাঁদের জানা নেই। কিন্তু যখন স্বল্প সময়ের প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের ফ্রন্টে যেতে বাধ্য করা হয়, তখনই বুঝতে পারেন যে তাঁরা প্রতারিত হয়েছেন। আর কখনো কখনো সেই প্রতারণার শেষ হয় মৃত্যুর মাধ্যমে। সেই মৃত্যু এক- একটি পরিবারকে আক্ষরিক অর্থেই অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেয়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়ে উঠেছিল হাজারটা স্বপ্ন নিয়ে। রুশ বিপ্লবের মূল নায়ক ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন প্রায় অসাধ্য সাধন করেছিলেন। মার্ক্সের তত্ত্ব অনুযায়ী সবচেয়ে এগিয়ে থাকা পুঁজিবাদের দেশেই বিপ্লব হওয়ার কথা। কিন্তু লেনিন ও তাঁর বলশেভিক দল রাশিয়ার মতো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা একটি দেশে বিপ্লব সাধন করে ফেললেন। নির্যাতিত মানুষ আশায় বুক বাঁধলেন, এবার সাম্য আসবে।

যদিও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সবার জন্য কর্মসংস্থান ইত্যাদি ব্যাপারে সোভিয়েত ইউনিয়ন সাফল্য দেখিয়েছিল, কিন্তু কোনোভাবেই সে রাষ্ট্র জনগণের রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারেনি। পার্টির মধ্যেই আমলাতন্ত্র শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। ঘুষ-দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি সবকিছুই ছিল বর্তমান। পার্টি নেতাদের লাগামহীন ক্ষমতা এবং সে ক্ষমতার অপব্যবহার সবই ছিল। সে আলোচনা এখানে না করলেও হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা ‘ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ’ বইটি পড়ে দেখতে পারেন। সেখানে এই পতনের কার্যকারণগুলো খুবই সঠিকভাবে বিবৃত হয়েছে।

সেই স্বপ্নের দেশটির পতন হয়েছিল বাইরের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে নিজের স্বৈরাচারী মনোবৃত্তির যোগফলে। এরপর সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের মাধ্যমে সেই দেশ থেকে বেরিয়ে ১৫টি স্বাধীন গণতান্ত্রিক আলাদা রাষ্ট্র যখন গড়ে উঠল, তখন পশ্চিম ইউরোপীয় ধাঁচে পূর্ব ইউরোপ ও মধ্যএশিয়ার দেশগুলোর জীবনযাত্রা গড়ে উঠবে, এ রকম একটি আশা জেগে উঠেছিল কারও কারও মনে। কিন্তু গণতন্ত্রের নামে যেভাবে এই দেশগুলোয় লুণ্ঠন চলেছে, যেভাবে অলিগার্করা লুটেপুটে খেয়েছে দেশগুলো, তাতে সেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে এই রুশ ফেডারেশন, ইউক্রেনসহ নতুন দেশগুলোর মিল খুঁজে পাওয়া নিতান্তই কষ্টকল্পনা। এখনকার রাশিয়া যেকোনো পুঁজিবাদী দেশের মতোই জনগণকে শোষণ করে টিকে আছে। দেশটি নিজেকে পুঁজিবাদী দেশ বলেই মনে করে থাকে। হারানো পরাক্রমশালী দেশের তকমা আবার পাওয়ার জন্য আগ্রহী।

আমাদের আজকের বিষয়বস্তুর মধ্যে সরাসরি না ঢুকে কেন ধান ভানতে শিবের গীত গাইলাম, তার ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। বিদেশে যারা লোক পাঠায়, তাদের দুরভিসন্ধি আজকের নয়। আদম ব্যবসার নামে এই অসাধু মানুষেরা নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয় আর নির্দয়ভাবে ভাগ্যবদলপ্রত্যাশী মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। ইতালিতে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব মানুষকে কীভাবে আদম ব্যবসায়ীরা ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে দিগন্তহীন দরিয়ায় নৌকায় তুলে দেয় এবং সে নৌকায় ভাসতে ভাসতে নানা কারণেই যাত্রীরা মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন কিংবা কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন, সে বার্তাও এখন কারও কাছে অজানা নয়। মালয়েশিয়ায় আদম ব্যবসার শিকার মানুষের জীবন কতটা বিপজ্জনক, সে কথা কে না জানে।

মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে এক পর্যটনকেন্দ্রের ওপরে পাহাড়ের মধ্যে একজন বাঙালি বাগান পরিচর্যাকারীকে দেখেছিলাম, যার কোনো কাগজপত্র ছিল না। এখানে কাজ করছেন কোনো চুক্তি ছাড়াই। প্রায় ক্রীতদাসের মতোই সেখানে থাকতে হচ্ছে তাঁকে। সামান্য অর্থে নিজের জীবনটা যাপন করে যাচ্ছেন। পাহাড়ের ওপর পুলিশ আসে না বলে রক্ষে। বাড়িতেও টাকা পাঠাতে পারছেন না।

সৌদি আরবে গৃহভৃত্যদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এখন আর নতুন নয়। এই ভয়াবহ ঘটনাগুলো ঘটান অভিজাত সম্প্রদায়ের মানুষেরা। এ ছাড়া এক কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও অন্য কাজ করতে বাধ্য করা, চুক্তি মোতাবেক টাকা না দেওয়া, ভুয়া ভিসা তৈরি করা, পাসপোর্ট আটকে রাখাসহ কত ধরনের অনিয়মই না করা হচ্ছে। কিন্তু এই মানুষের সুরক্ষিত রাখার কথা যাঁদের, তাঁরা আসলে কী করেন? নাকে তেল দিয়ে ঘুমানোর জন্যই কি তাঁদের দূতাবাসে চাকরি দেওয়া হয়?

আমাদের দেশের অসৎ মানুষেরা তো বটেই, অন্য যেসব দেশে মানব পাচার হয়, সেসব দেশের অসৎ মানুষের সহযোগিতা ছাড়া এই অপকর্ম করা সম্ভব হতো না। সরকারি কর্তৃপক্ষের কেউ কেউ এই অসৎ কাজে যুক্ত থাকে। এসব এতটাই ওপেন সিক্রেট যে কেউই তাতে আর বিস্মিত হয় না। এই দুষ্টচক্রটি ভাঙতে হলে সরকারের যেমন সদিচ্ছা থাকা দরকার, তেমনি ভাগ্য পরিবর্তনপ্রত্যাশী মানুষদেরও সচেতন হওয়া দরকার।

মানুষ কেন এই ফাঁদে পা দিচ্ছে? প্রথমেই বলতে হবে, বেকারত্বের গ্লানি সইতে না পেরে অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমাতে চান। একটু সুখের মুখ দেখবেন বলে জমানো টাকা, জমি বিক্রি করে তা দালালের হাতে দিয়ে দেন। দালালেরাও তখন এমন আশ্বাস দিয়ে থাকে যে ওই দেশে গিয়ে হাজির হলেই থোকা থোকা টাকা এসে পকেটে জমা হবে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে রাশিয়ায় যেকোনো কাজে যোগ দেওয়ার জন্য মনস্থির করে মানুষ। এরপর অতিরিক্ত বেতনের প্রলোভন। যে অঙ্কটি বলা হয়, তার সঙ্গে মূল বেতনের কোনো সামঞ্জস্য থাকে না। দালালেরা চেনাজানা মানুষ হয়ে থাকে। পরিচিত ব্যক্তি, আত্মীয়, কথিত বৈধ নিয়োগ সংস্থা, ভিসা ও বিমান টিকিট—সব মিলিয়ে প্রতারণাকে প্রকৃত চাকরির সুযোগ বলে মনে হতে পারে।

চুক্তির ব্যাপারে যে স্বচ্ছতা থাকে না, সেটা তো দেখাই যাচ্ছে। রাশিয়া কেন বিভিন্ন দেশ থেকে দালালদের মাধ্যমে লোক সংগ্রহ করছে, এ রকম প্রশ্নের উত্তর সবাই জানে। আমাদের মনে পড়ে যাবে, আফগানিস্তানের সরকারকে সমর্থন দিতে ১৯৭৯ সালে যে সোভিয়েত সেনারা সে দেশটায় গিয়েছিল, তাঁদের অনেকেই ফিরে এসেছিলেন লাশ হয়ে। প্রায় ১০ বছরব্যাপী সোভিয়েত সেনাদের আফগানিস্তানে অবস্থান স্বভাবতই কমিউনিস্ট সরকারের জনপ্রিয়তা কমিয়েছিল। সে কথা বিবেচনা করেই কি নিজেদের সেনাদের সুরক্ষিত রেখে বাইরের দেশের মানুষকে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে? এই অসহায় মানুষের কেউ কি সেনা হিসেবে যুদ্ধ করতে যাওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে?

রাশিয়া আর ইউক্রেন যুদ্ধ করবে আর সেখানে কোনো কারণ ছাড়াই মৃত্যুবরণ করবেন আমাদের দেশের মানুষ, এটা মেনে নেওয়া যায় না। যা যা অবশ্যকরণীয়, তার কিছু এখানে বলছি।

এক. বাংলাদেশি দালাল, রিক্রুটিং এজেন্সি, বিদেশি মধ্যস্থতাকারী, অর্থ লেনদেন এবং ভিসা ব্যবস্থার যোগসূত্র অনুসন্ধান করতে হবে।

তিন. বিদেশে আটকেপড়া কর্মীদের উদ্ধার: দূতাবাস, কনস্যুলার সহায়তা ও প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করতে হবে।

চার. প্রতারিত পরিবারের মামলা পরিচালনা, উদ্ধার ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

আর সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো বিদেশে যাওয়ার আগেই চাকরির চুক্তি, নিয়োগকর্তা, ভিসার ধরন, কাজের স্থান এবং সামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক আছে কি না—এসব যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা করতে হবে।

সরকার যেন এসব ব্যাপারে নাকে তেল দিয়ে না ঘুমায়, তার ব্যবস্থাও করতে হবে।

জেলেদের সঙ্গে প্রতারণা

জেলেদের সঙ্গে প্রতারণা

মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ সময় জেলেরা যাতে জীবিকার সংকটে না পড়েন, সে জন্য সরকার প্রতি জেলেকে ২৫ কেজি করে বিনা মূল্যে চাল বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার সময় পেরিয়ে গেলেও পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার রণগোপালদী ও দশমিনা ইউনিয়নের কোনো জেলেই চাল পাননি।

বাড়ছে উচ্চশিক্ষিত বেকার, করণীয় কী

বাড়ছে উচ্চশিক্ষিত বেকার, করণীয় কী

দেশে শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের উচ্চ হার নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সনদ হাতে নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তাঁরা বুঝতে পারেন শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই চাকরি মেলে না।