সমাজ আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে

  • দৈনিক টার্গেট
  • প্রকাশ: ০৯:০৮:২০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৪ বার পঠিত হয়েছে

বোঝা যাচ্ছে যে স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডকে ধিক্কার দেওয়ার, ধমক দেওয়ার শক্তি সমাজে এখন আর নেই। এ-ও এক করুণ নিম্নগমন বটে। তৃতীয়ত, সমাজের সর্বত্র নৃশংসতা ভয়ংকরভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। হত্যাকাণ্ড আগেও ঘটত, কিন্তু হত্যা করে মৃতদেহটিকে টুকরা টুকরা করে ফেলার ঘটনা সহিংসতার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রার সংযোজন বটে। শিশু-নারী ধর্ষণ ও কিশোর ধর্ষণের ঘটনাও প্রবলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি ওদের ভেতরের ঘৃণ্য মানসিকতারই বাইরের প্রকাশ।

অবস্থা এমন যে মনে হয় আমাদের কোনো আশা নেই, কেননা যা চোখে পড়ে তা হলো সমাজে আজ সকলেই সকলের শত্রু, পারস্পরিক মৈত্রীর সব সম্ভাবনাই বুঝি-বা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। প্রকৃত সত্য কিন্তু ভিন্ন রকমের। সমাজের অধিকাংশ মানুষই দেশপ্রেমিক। তারপরেও দেশে গণতান্ত্রিক চেতনার যে মহা-দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে, তাও নয়। নিকট অতীতে তারা গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, ভবিষ্যতে যে ঘটাতে পারবে না, তা মনে করার কারণ নেই। কিন্তু এই মানুষেরা বিচ্ছিন্ন ও বিপন্ন, তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না। তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে দেওয়া হচ্ছে না এবং তাদের ভেতরকার ঐক্যের অভাবই শত্রুপক্ষের প্রধান ভরসা।

সাহিত্যে যেমন জীবনেও তেমনি, মন্দই চোখে পড়ে সহজে। সে-ই দৌরাত্ম্য করে, কিন্তু সব মন্দই নৈতিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল; নির্লজ্জ ও নৃশংস বলে তাকে পরাস্ত করা কঠিন। কিন্তু মোটেই অসম্ভব নয়। মানুষের সংস্কৃতির যে অগ্রগতি, তা ওই মন্দকে পরাভূত করেই ঘটেছে; আমাদের দেশেও তেমনটাই ঘটবে।

আগে আমরা জানতাম শত্রু হচ্ছে বিদেশি; সেই শত্রু রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রেখে আমাদের শোষণ করছে। ওই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি, আমাদের মধ্যে দেশপ্রেম শক্তিশালী হয়েছে। এখন রাষ্ট্রক্ষমতা দেশি মানুষের হাতে। কিন্তু ক্ষমতা যাঁদের হাতে, তাঁরা দেশপ্রেমের কোনো দৃষ্টান্ত তো তুলে ধরেনই না, উপরন্তু জনগণকে শোষণ করার কাজ আগের শাসকদের মতোই অব্যাহত রেখেছেন। জনগণের তাঁরা আর যা-ই হোন, মিত্র নন। যেহেতু তাঁরা দেশি এবং নিজেদের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখার তাগিদে জনগণকে বিভক্ত করতে অত্যুৎসাহী ও সক্ষম, তাই তাঁদের বিরুদ্ধে লড়াইটা জমে ওঠে না, এবং আবার লড়াইয়ের পেছনে যে দেশপ্রেম ছিল, তাও আর বিকশিত হয় না।

অন্যদিকে ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের যে আদর্শ দেশের শাসকেরা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন, তার প্রভাবে সাধারণ মানুষও দেশের কথা না ভেবে কেবলই নিজের স্বার্থের কথা ভাবেন। উভয় কারণেই সমষ্টিগত মুক্তির যে স্বপ্ন অতীতে আমাদের পরিচালিত করত এবং কঠিন দুঃসময়েও আশাবাদী করে রেখেছিল, সে স্বপ্নটি এখন আর কার্যকর নেই। বস্তুত, সেটি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। প্রায় প্রত্যেকটি মানুষের জন্যই একটি করে দুঃস্বপ্নের জন্ম দিয়েছে। দেশপ্রেম হারিয়ে আমরা ভীষণভাবে আত্মপ্রেমিক হয়ে পড়েছি।

দেশে জ্ঞানী, গুণী আর দক্ষ লোকের কোনো অভাব নেই। আমাদের লোকেরা বিদেশে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। কিন্তু দেশপ্রেমের অভাবের দরুন জ্ঞান, গুণ ও দক্ষতাকে সৃষ্টিশীলতার কাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বন্ধ্যত্বের আসল কারণটা রয়েছে এখানেই।

আরও একটা ঘটনা ঘটেছে। সেটা হলো কৃষিকে অবহেলা করা। আমাদের স্বাভাবিক নির্ভরতা হচ্ছে কৃষির ওপর। তাকে উপেক্ষা করে যে আমরা এক পাও এগোতে পারব না, তার প্রমাণ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পর দেশে এখন যে খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে তার মধ্যে পাওয়া যাবে। কৃষিকে অবজ্ঞা করার ঘটনা কেবল যে বাংলাদেশে ঘটেছে তা নয়, এটি বিশ্বপুঁজিবাদী ব্যবস্থারই একটি অংশ। পুঁজিবাদ কৃষিকে ব্যবহার করে ঠিকই কিন্তু উৎসাহী থাকে বৃহৎ শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে। আমরাও ওই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনেই রয়েছি।

অন্যদিকে আরেক ঘটনা ঘটে চলছে। সেটা হলো ঋণবৃদ্ধি। বাংলাদেশ বিদেশি সংস্থার কাছ থেকে ঋণ করেছে এটা আমরা জানি, কিন্তু এখন যেটা করছে তা হলো দেশি ব্যাংক ও বিদেশি ব্যাংকের স্থানীয় শাখা থেকে ঋণ গ্রহণ। সরকারি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ফলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পেয়ে অনুৎপাদনশীল সরকারি খাতগুলোতেই খরচা বাড়ছে। প্রয়োজনে সরকার ঋণ গ্রহণ করবে নিশ্চয়ই, কিন্তু তা করা দরকার ব্যাংক থেকে নয়, দেশবাসীর কাছ থেকে। এর জন্য নানা ধরনের বন্ড বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বলা বাহুল্য, এই ক্ষেত্রেও অভাব যেটির, সেটি অন্য কিছু নয়, দেশপ্রেমেরই।

দেশপ্রেমের সমস্যাটা দূর করার জন্য রাজনৈতিক আন্দোলন দরকার। তেমন আন্দোলন যা এক দল বা গোষ্ঠীকে সরিয়ে অন্য দল বা গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসাবে না, রাষ্ট্রের ওপর জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করবে। এটিরই আজ বড় অভাব। আর এই অভাবের জন্যই সর্বত্র এত হতাশা। যাঁরা দেশপ্রেমিক, তাঁদের প্রথম কর্তব্য হলো এই রাজনৈতিক আন্দোলনকে গভীরতা ও ব্যাপকতা দেওয়া। না হলে সংকট থেকে আমরা কিছুতেই বের হয়ে আসতে পারব না।

আমাদের এই সমাজেই একশ্রেণির মানুষ আছে, যারা বছরের পর বছর নীরবে কাজ করে চলে। তাদের শ্রমে-ঘামে আমাদের দেশের অর্থনীতি চলে, আমাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা হয়। কিন্তু তাদের দুঃখ দেখার কেউ নেই। তারা সংঘটিত নয়, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সারা বাংলার গ্রামেগঞ্জে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

জনপ্রিয় টার্গেট

সমাজ আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে

প্রকাশ: ০৯:০৮:২০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বোঝা যাচ্ছে যে স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডকে ধিক্কার দেওয়ার, ধমক দেওয়ার শক্তি সমাজে এখন আর নেই। এ-ও এক করুণ নিম্নগমন বটে। তৃতীয়ত, সমাজের সর্বত্র নৃশংসতা ভয়ংকরভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। হত্যাকাণ্ড আগেও ঘটত, কিন্তু হত্যা করে মৃতদেহটিকে টুকরা টুকরা করে ফেলার ঘটনা সহিংসতার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রার সংযোজন বটে। শিশু-নারী ধর্ষণ ও কিশোর ধর্ষণের ঘটনাও প্রবলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি ওদের ভেতরের ঘৃণ্য মানসিকতারই বাইরের প্রকাশ।

অবস্থা এমন যে মনে হয় আমাদের কোনো আশা নেই, কেননা যা চোখে পড়ে তা হলো সমাজে আজ সকলেই সকলের শত্রু, পারস্পরিক মৈত্রীর সব সম্ভাবনাই বুঝি-বা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। প্রকৃত সত্য কিন্তু ভিন্ন রকমের। সমাজের অধিকাংশ মানুষই দেশপ্রেমিক। তারপরেও দেশে গণতান্ত্রিক চেতনার যে মহা-দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে, তাও নয়। নিকট অতীতে তারা গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে, ভবিষ্যতে যে ঘটাতে পারবে না, তা মনে করার কারণ নেই। কিন্তু এই মানুষেরা বিচ্ছিন্ন ও বিপন্ন, তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না। তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে দেওয়া হচ্ছে না এবং তাদের ভেতরকার ঐক্যের অভাবই শত্রুপক্ষের প্রধান ভরসা।

সাহিত্যে যেমন জীবনেও তেমনি, মন্দই চোখে পড়ে সহজে। সে-ই দৌরাত্ম্য করে, কিন্তু সব মন্দই নৈতিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল; নির্লজ্জ ও নৃশংস বলে তাকে পরাস্ত করা কঠিন। কিন্তু মোটেই অসম্ভব নয়। মানুষের সংস্কৃতির যে অগ্রগতি, তা ওই মন্দকে পরাভূত করেই ঘটেছে; আমাদের দেশেও তেমনটাই ঘটবে।

আগে আমরা জানতাম শত্রু হচ্ছে বিদেশি; সেই শত্রু রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রেখে আমাদের শোষণ করছে। ওই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি, আমাদের মধ্যে দেশপ্রেম শক্তিশালী হয়েছে। এখন রাষ্ট্রক্ষমতা দেশি মানুষের হাতে। কিন্তু ক্ষমতা যাঁদের হাতে, তাঁরা দেশপ্রেমের কোনো দৃষ্টান্ত তো তুলে ধরেনই না, উপরন্তু জনগণকে শোষণ করার কাজ আগের শাসকদের মতোই অব্যাহত রেখেছেন। জনগণের তাঁরা আর যা-ই হোন, মিত্র নন। যেহেতু তাঁরা দেশি এবং নিজেদের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখার তাগিদে জনগণকে বিভক্ত করতে অত্যুৎসাহী ও সক্ষম, তাই তাঁদের বিরুদ্ধে লড়াইটা জমে ওঠে না, এবং আবার লড়াইয়ের পেছনে যে দেশপ্রেম ছিল, তাও আর বিকশিত হয় না।

অন্যদিকে ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের যে আদর্শ দেশের শাসকেরা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন, তার প্রভাবে সাধারণ মানুষও দেশের কথা না ভেবে কেবলই নিজের স্বার্থের কথা ভাবেন। উভয় কারণেই সমষ্টিগত মুক্তির যে স্বপ্ন অতীতে আমাদের পরিচালিত করত এবং কঠিন দুঃসময়েও আশাবাদী করে রেখেছিল, সে স্বপ্নটি এখন আর কার্যকর নেই। বস্তুত, সেটি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। প্রায় প্রত্যেকটি মানুষের জন্যই একটি করে দুঃস্বপ্নের জন্ম দিয়েছে। দেশপ্রেম হারিয়ে আমরা ভীষণভাবে আত্মপ্রেমিক হয়ে পড়েছি।

দেশে জ্ঞানী, গুণী আর দক্ষ লোকের কোনো অভাব নেই। আমাদের লোকেরা বিদেশে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। কিন্তু দেশপ্রেমের অভাবের দরুন জ্ঞান, গুণ ও দক্ষতাকে সৃষ্টিশীলতার কাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বন্ধ্যত্বের আসল কারণটা রয়েছে এখানেই।

আরও একটা ঘটনা ঘটেছে। সেটা হলো কৃষিকে অবহেলা করা। আমাদের স্বাভাবিক নির্ভরতা হচ্ছে কৃষির ওপর। তাকে উপেক্ষা করে যে আমরা এক পাও এগোতে পারব না, তার প্রমাণ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পর দেশে এখন যে খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে তার মধ্যে পাওয়া যাবে। কৃষিকে অবজ্ঞা করার ঘটনা কেবল যে বাংলাদেশে ঘটেছে তা নয়, এটি বিশ্বপুঁজিবাদী ব্যবস্থারই একটি অংশ। পুঁজিবাদ কৃষিকে ব্যবহার করে ঠিকই কিন্তু উৎসাহী থাকে বৃহৎ শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে। আমরাও ওই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনেই রয়েছি।

অন্যদিকে আরেক ঘটনা ঘটে চলছে। সেটা হলো ঋণবৃদ্ধি। বাংলাদেশ বিদেশি সংস্থার কাছ থেকে ঋণ করেছে এটা আমরা জানি, কিন্তু এখন যেটা করছে তা হলো দেশি ব্যাংক ও বিদেশি ব্যাংকের স্থানীয় শাখা থেকে ঋণ গ্রহণ। সরকারি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ফলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পেয়ে অনুৎপাদনশীল সরকারি খাতগুলোতেই খরচা বাড়ছে। প্রয়োজনে সরকার ঋণ গ্রহণ করবে নিশ্চয়ই, কিন্তু তা করা দরকার ব্যাংক থেকে নয়, দেশবাসীর কাছ থেকে। এর জন্য নানা ধরনের বন্ড বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বলা বাহুল্য, এই ক্ষেত্রেও অভাব যেটির, সেটি অন্য কিছু নয়, দেশপ্রেমেরই।

দেশপ্রেমের সমস্যাটা দূর করার জন্য রাজনৈতিক আন্দোলন দরকার। তেমন আন্দোলন যা এক দল বা গোষ্ঠীকে সরিয়ে অন্য দল বা গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসাবে না, রাষ্ট্রের ওপর জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করবে। এটিরই আজ বড় অভাব। আর এই অভাবের জন্যই সর্বত্র এত হতাশা। যাঁরা দেশপ্রেমিক, তাঁদের প্রথম কর্তব্য হলো এই রাজনৈতিক আন্দোলনকে গভীরতা ও ব্যাপকতা দেওয়া। না হলে সংকট থেকে আমরা কিছুতেই বের হয়ে আসতে পারব না।

আমাদের এই সমাজেই একশ্রেণির মানুষ আছে, যারা বছরের পর বছর নীরবে কাজ করে চলে। তাদের শ্রমে-ঘামে আমাদের দেশের অর্থনীতি চলে, আমাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা হয়। কিন্তু তাদের দুঃখ দেখার কেউ নেই। তারা সংঘটিত নয়, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সারা বাংলার গ্রামেগঞ্জে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে।