বাজেটে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দাবি

রাজনীতি

আসন্ন জাতীয় বাজেটকে কেন্দ্র করে পুরোনো ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে এসে জনগণকেন্দ্রিক ও জবাবদিহিমূলক বাজেট প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। একই সঙ্গে কর ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন অর্থনীতিবিদ, সাবেক আমলা ও নীতিনির্ধারকরা।

বৃহস্পতিবার রাজধানীতে আয়োজিত “বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের বাজেট: কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সংস্কারে অগ্রাধিকার এবং জনপ্রত্যাশার বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ” শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব মতামত উঠে আসে। অনুষ্ঠানের প্রথম অধিবেশনে দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, কর কাঠামো, ব্যাংক খাত ও বাজেট বাস্তবায়নের নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়।

সভায় বক্তারা বলেন, দেশের মানুষ কর দিতে অনাগ্রহী নয়, তবে তারা ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা চায়। নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে বড় শিল্পগোষ্ঠী ও প্রভাবশালীদেরও করের আওতায় আনার দাবি জানান তারা। পাশাপাশি কর আদায়ে অনলাইনভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থা ও “ফেসলেস” বা সরাসরি যোগাযোগবিহীন ডিজিটাল পদ্ধতি চালুর সুপারিশ করা হয়।

অনুষ্ঠানে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, অতীতের বাজেটগুলো সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং সেই সুযোগে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। তিনি বলেন, এবারের বাজেট যেন কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার দলিল না হয়ে সাধারণ মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করে।

ছায়া বাজেট প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড. আতিক মুজাহিদ জানান, বাজেট প্রস্তাব তৈরির আগে তারা শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এসব মতবিনিময় থেকে তারা বুঝেছেন, মানুষ এমন একটি করব্যবস্থা চায় যেখানে বৈষম্য কম থাকবে এবং ব্যবসা পরিচালনায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।

সাবেক অর্থসচিব ও সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও উদ্বেগজনকভাবে কম। সরকার যদি অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি বিনিয়োগ ব্যাহত হবে। আবার অতিরিক্ত টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। তিনি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে একীভূত ও ডিজিটালাইজ করার প্রস্তাব দেন। তার মতে, এতে প্রশাসনিক ব্যয় কমবে এবং আরও বেশি মানুষ সুবিধা পাবে।

তিনি আরও বলেন, দুর্বল ও অকার্যকর ব্যাংকগুলো বন্ধ বা একীভূত করে ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কর আদায়ে স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করলে দুর্নীতি ও হয়রানি কমবে।

সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বাজেটের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। তিনি এটিকে স্বচ্ছতার বড় ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, সরকারের চলতি ব্যয় রাজস্ব আয়ের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে, ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন ব্যয় কমে যাচ্ছে।

কর ফাঁকি কমাতে এনআইডির সঙ্গে ব্যাংক হিসাব, ভূমি রেজিস্ট্রেশন ও গাড়ির তথ্য সংযুক্ত করে সমন্বিত কর ব্যবস্থাপনার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে এনবিআরের নীতিনির্ধারণ ও রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্ব আলাদা করার দাবি জানান।

অর্থনীতিবিদ ড. খান জহিরুল ইসলাম দেশের ব্যাংকিং খাতকে “গভীর সংকটে” বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ অর্থনীতির বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, এই অর্থ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় পরিবর্তন আসতে পারত।

সভাপতির বক্তব্যে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, কর ব্যবস্থায় বৈষম্য দূর করা না গেলে জনগণের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যাবে। তিনি অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো সংস্কার প্রক্রিয়াকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে।

আলোচনা সভায় অংশ নেওয়া বক্তারা মনে করেন, আগামী বাজেটে কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক কাঠামো নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।