শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রয়টার্স জানায়, ৪৯ বছর বয়সী দেনিস কাতিউখা তাঁর মালিকানাধীন ‘অ্যাডমিরাল’ হোটেল এবং মেলিতোপোল শহরের একটি অ্যাপার্টমেন্ট রাশিয়ার দখলে যাওয়ার পর ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করেছেন। প্রায় ১১ মাসের আইনি লড়াই শেষে গত ৩০ এপ্রিল ইউক্রেনের একটি আদালত তাঁর পক্ষে ৫১ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণের রায় দেন। তবে রাশিয়া এই অর্থ পরিশোধ করবে, এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
রাশিয়ার অনুপস্থিতিতেই মামলার শুনানি চলে। আদালতে বিবাদী হিসেবে রাশিয়ার নাম ডাকা হলেও কেউ হাজির হয়নি। কাতিউখা বলেন, ‘আপাতত আমিই ভুক্তভোগী—বাতাসের সঙ্গে লড়াই করা এক ডন কিহোতে।’
ইউক্রেনের ভূখণ্ডকে রাশিয়ার অংশে পরিণত করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এসব সম্পত্তি দখল করা হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের জাতীয় নিরাপত্তা ফেলো কারোলিনা হির্ডের মতে, সম্পত্তি দখলের মাধ্যমে অঞ্চলগুলোর ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ সুসংহত হচ্ছে এবং যুদ্ধ পরিচালনার জন্য অর্থও আসছে।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, অধিকৃত অঞ্চলে নতুন সম্পত্তি আইন চালু করে মালিকানা কেড়ে নেওয়ার জন্য আইনি আড়াল তৈরি করছে রাশিয়া। এসব আইনে রুশ নাগরিকত্ব গ্রহণ না করলে ইউক্রেনীয়দের সম্পত্তির মালিকানা হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে।
তবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভের দাবি, যাঁরা চেয়েছেন, তাঁদের সম্পত্তি রুশ আইনে পুনর্নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যাঁরা তা করেননি, তাঁদের সম্পত্তি মালিকহীন ঘোষণা করা হয়েছে।
মেলিতোপোলের বাসিন্দা কাতিউখার শৈশবের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে ছিল আজভ সাগরের উপকূলীয় গ্রাম কিরিলিভকার সঙ্গে। শ্বাসকষ্টের সমস্যার কারণে ছোটবেলায় তিনি গ্রীষ্মকাল কাটাতেন দাদার সঙ্গে এই গ্রামে। সেখানকার নির্মল বাতাস, নীল সমুদ্র ও সমুদ্রসৈকতের পরিবেশ তাঁকে মুগ্ধ করেছিল।
২০২১ সালে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের হিসাবে, কিরিলিভকায় প্রায় ২০ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেছিলেন। সে বছর আতিথেয়তা খাতে বিশেষ অবদানের জন্য ‘অ্যাডমিরাল’ হোটেলটি ‘হসপিটালিটি অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারও পায়।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে কাতিউখা জার্মানিতে অবস্থান করছিলেন। সে সময় তাঁর বাবা জানান, সশস্ত্র কয়েকজন ব্যক্তি হোটেলে ঢুকে সেটিকে মালিকহীন ঘোষণা করেছেন। মাত্র তিন দিনের মধ্যে মালিকানার প্রমাণ জমা দিতে বলা হয়। কিন্তু দখলদার কর্তৃপক্ষ ইউক্রেনীয় পাসপোর্ট ও সম্পত্তির দলিল স্বীকার করেনি। কাতিউখার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বাবাকে বলা হয়েছিল, ‘এগুলো অস্তিত্বহীন একটি দেশের নথি।’
পরে হোটেলটির নতুন মালিক হিসেবে রুশ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘রিসোর্টস অব জাপোরিঝঝিয়া রিজিয়ন’-এর নাম ঘোষণা করা হয়। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটির নিট আয় ছিল ৬৫ কোটি ৭০ লাখ রুবল, যা প্রায় আট লাখ ডলারের সমান।
২০২৩ সালের মাঝামাঝি ক্ষয়ক্ষতির হিসাব তৈরি শুরু করেন কাতিউখা। আইনজীবীর সহায়তায় প্রায় তিন হাজার পৃষ্ঠার নথি প্রস্তুত করেন তিনি। হোটেলের প্রতিটি কক্ষের মাইক্রোওয়েভ ও ঝাড়বাতি থেকে শুরু করে ওক কাঠের টেবিল, এমনকি ২০ সেন্টের ক্যান ওপেনারের দামও হিসাবের মধ্যে রাখেন। নির্মাণসামগ্রী, যন্ত্রপাতি, ব্যাংক হিসাব ও কেনাকাটার রসিদ যুক্ত করে তৈরি করেন ক্ষতিপূরণের দাবি।
শেষ পর্যন্ত আদালত রাশিয়ার কর্মকাণ্ডকে কার্যত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার শামিল বলে উল্লেখ করে তাঁর পক্ষে রায় দেন।
এ ছাড়া ইউক্রেনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংরক্ষণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-সমর্থিত হেগভিত্তিক ‘রেজিস্টার অব ড্যামেজ ফর ইউক্রেন’-এও আবেদন করেছেন কাতিউখা। সেখানে তাঁর মতো এক লাখ ৯৫ হাজারের বেশি ব্যক্তি ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন। ভবিষ্যতে মোট ৬০ থেকে ৮০ লাখ আবেদন জমা পড়তে পারে বলে ধারণা করছে সংস্থাটি। তবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অর্থায়নব্যবস্থা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
কাতিউখা জানেন, জীবদ্দশায় হয়তো রাশিয়ার কাছ থেকে কোনো অর্থই পাবেন না। তবু তাঁর আশা, ন্যায়বিচারের জন্য এই লড়াই একদিন তাঁর নাতি-নাতনিদের কাজে আসবে।

দৈনিক টার্গেট 


























