জ্বালানি সংকটে মানুষের ভোগান্তি, মার্কিন কোম্পানিগুলোর মুনাফা ১৩ হাজার কোটি ডলার

  • দৈনিক টার্গেট
  • প্রকাশ: ০১:৪৮:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
  • ৮ বার পঠিত হয়েছে

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস প্রকাশিত এক হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৫১টি বড় তেল ও গ্যাস কোম্পানির গত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর ছয় মাসের আর্থিক কার্যক্রমের ভিত্তিতে মুনাফার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। পত্রিকাটির এই হিসাবকে রক্ষণশীল মূল্যায়ন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তুলনায়, ২০২৫ সালের একই সময়ে, অর্থাৎ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর আগে যখন তেলের দাম কম ছিল, তখন এসব কোম্পানি সম্মিলিতভাবে ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের কম মুনাফা করেছিল।

তবে তেল কোম্পানিগুলোর এই মুনাফা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় সাধারণ মানুষকে চাপে ফেলছে। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট সলিউশনস ল্যাবের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা পেট্রল ও ডিজেল কিনতে অতিরিক্ত ১৫ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করেছেন। পরিবারপ্রতি এই বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ ১ হাজার ১৫০ ডলারের বেশি।

যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কোম্পানিগুলো বিভিন্নভাবে লাভবান হয়েছে বলে মনে করেন ইতালির মিলানে অবস্থিত ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল স্টাডিজের (আইএসপিআই) ফেলো নাসের আল-তামিমি। তাঁর ভাষায়, ‘অপরিশোধিত তেল উৎপাদকেরা বেশি দামের কারণে লাভবান হচ্ছে। অন্যদিকে, ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির সরবরাহ কমে যাওয়ায় শোধনাগারগুলো অস্বাভাবিক বেশি মুনাফা করছে।’

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম দুই তেল কোম্পানি এক্সনমবিল ও শেভরন ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে মুনাফার কথা জানিয়েছে। মুনাফার এই পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হলেও দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের হিসাব বলছে, সাধারণভাবে তা ২০২২ সালের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ওই বছর ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারে উঠে গিয়েছিল। প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও বেড়েছিল। অন্যদিকে, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তেলের গড় দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার।

মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ কমেছে এবং মজুতও ফুরিয়ে এসেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের তেল পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলোও বেশি মুনাফা করেছে। ভ্যালেরো এনার্জির তৃতীয় প্রান্তিকের মুনাফা আগের তুলনায় ছয় গুণের বেশি বেড়ে ৬৮৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। আর ফিলিপস ৬৬ জানিয়েছে, কোম্পানিটির ইতিহাসে কোনো এক প্রান্তিকে এটাই সর্বোচ্চ মুনাফা। এক বছর আগে একই সময়ে তাদের নিট আয় ছিল ১৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬২ কোটি ডলারে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং গালফ স্টেটস ইনসাইটস নিউজলেটারের সম্পাদক জিওফ্রে মিলার বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ ‘বহু বছরের মধ্যে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহে সবচেয়ে বড় ধাক্কা তৈরি করেছে’।

মিলার আরও বলেন, এই যুদ্ধের ফলে তেলের দামে এমন একটি ঝুঁকিজনিত বাড়তি মূল্য যুক্ত হয়েছে, যা থেকে মুনাফা করার ক্ষেত্রে কাঠামোগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিগুলো। বিপরীতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদকেরা বেশি ব্যয়, নিরাপত্তাঝুঁকি এবং অবকাঠামোর সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। ফলে তেলের দাম বাড়লেও তাদের পক্ষে সেই সুবিধা কাজে লাগানো অনেক কঠিন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত স্বাধীন সংঘাত পর্যবেক্ষণ সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি) জানিয়েছে, ইরান ও অঞ্চলটিতে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো জিসিসির ছয় সদস্যদেশে বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে অন্তত ১৭২টি হামলা চালিয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তাঁদের লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা। তবে এসব হামলায় জ্বালানি অবকাঠামোও আক্রান্ত হয়েছে।

এদিকে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল ও গ্যাসের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে। পাল্টাপাল্টি এসব পদক্ষেপের ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা চলতে পারে। জুনে একটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর গ্রীষ্মকালে কিছু সময়ের জন্য তেলের দাম কমেছিল। কিন্তু আলোচনা ভেঙে পড়ার পর দাম আবার দ্রুত বেড়ে যায়।

এর মধ্যে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা বাব আল-মান্দেব প্রণালিও এখন যুদ্ধের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তেল রপ্তানির জন্য এই জলপথ ব্যবহার করে সৌদি আরব।

জিওফ্রে মিলার বলেন, ‘স্বল্প মেয়াদে আকস্মিকভাবে পাওয়া এই বিপুল মুনাফা তেল কোম্পানিগুলোর আর্থিক ভিত্তি এবং শেয়ারধারীদের আয় আরও শক্তিশালী করবে।’ তবে এই বিপুল মুনাফার সঙ্গে বড় ধরনের ঝুঁকিও রয়েছে। তাঁর মতে, দীর্ঘ মেয়াদে তেলের উচ্চমূল্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এমনকি মন্দা পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। এর ফলে তেলের চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে রূপান্তরের গতি আরও বাড়তে পারে।

লন্ডনে রাবোব্যাংকের বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাজারবিষয়ক দলের জ্যেষ্ঠ জ্বালানি কৌশলবিদ ফ্লোরেন্স শ্মিট মনে করেন, ইরানের যুদ্ধ কত দিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পণ্যের দাম উঁচু পর্যায়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শ্মিট বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে সরবরাহে এই ধাক্কার প্রভাব যেসব বাজারে পড়েছে, যুক্তরাষ্ট্রও তার মধ্যে রয়েছে। এসব বাজারে আগামী বছরও দাম বেশি থাকবে। সরকার হস্তক্ষেপ না করলে ভোক্তাদের ওপর এই মূল্যচাপ অব্যাহত থাকবে।’

ট্রাম্প অবশ্য বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করার চেষ্টা করেছেন। রাশিয়ার শোধনাগারগুলোতে হামলা বন্ধ করতে তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর চাপ দিয়েছেন। অথচ মস্কো ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা অব্যাহত রেখেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের যুক্তি, রাশিয়ার সঙ্গে এমন একটি চুক্তি হলে, যার মাধ্যমে কয়েক বছরের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে, ডিজেলের দাম কমতে পারে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে বিশ্লেষকেরা বলছেন, যেসব তেল রপ্তানিকারক দেশ জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পারবে, তারা বেশি দামের কারণে লাভবান হবে। তবে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা ও বিনিয়োগের ওপর হুমকি তৈরি করবে।

আইএসপিআইয়ের নাসের আল-তামিমি বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদক দেশগুলোকে অবকাঠামো পুনর্গঠনে কয়েক বছর সময় দিতে হবে। পাশাপাশি রপ্তানির বিকল্প পথ তৈরির চাপও থাকবে। কূটনৈতিক সমঝোতা হলে দাম কমতে পারে। অন্যদিকে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন করে হামলা হলে আরেকটি আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে হরমুজ প্রণালিতে আবারও বিঘ্ন ঘটতে পারে এবং সরবরাহসংকট দীর্ঘায়িত হতে পারে।’

ফের শান্তি আলোচনা শুরুর সম্ভাবনায় কমল তেলের দাম

ফের শান্তি আলোচনা শুরুর সম্ভাবনায় কমল তেলের দাম

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ফের মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নিয়েছেন। বুধবার দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তা ও আলোচনাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে জানায়, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজাইকে চিঠি পাঠিয়েছেন ভ্যান্স।

পোশাক রপ্তানি বেড়েছে, পিছিয়ে উচ্চমূল্যের পণ্য

পোশাক রপ্তানি বেড়েছে, পিছিয়ে উচ্চমূল্যের পণ্য

দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ আসছে এমন সব পোশাক থেকে, যেগুলো দেশের প্রচলিত রপ্তানি পণ্যের তালিকায় আগে থেকে শীর্ষে রয়েছে। বিপরীতে তুলনামূলক উচ্চমূল্যের পোশাকের রপ্তানি বাড়ছে ধীরগতিতে। কিছু পণ্যের রপ্তানি আবার কমেও গেছে।

এআইতে বদলে যাচ্ছে চীনের কৃত্রিম হীরার বাজার

এআইতে বদলে যাচ্ছে চীনের কৃত্রিম হীরার বাজার

চীনের কৃত্রিম হীরা উৎপাদকেরা গয়না তৈরির বাজারের বাইরে নতুন সম্ভাবনা খুঁজছেন। তীব্র প্রতিযোগিতা ও দাম কমে আসার চাপে তাঁদের লক্ষ্য এখন সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সার্ভার এবং অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তির কাজে ব্যবহারের উপযোগী উন্নত উপকরণ তৈরি। বিশাল এই শিল্পের ভবিষ্যৎ যে শুধু রত্নপাথরের

জনপ্রিয় টার্গেট

কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দীর ঢাকা মেডিকেলে মৃত্যু

জ্বালানি সংকটে মানুষের ভোগান্তি, মার্কিন কোম্পানিগুলোর মুনাফা ১৩ হাজার কোটি ডলার

প্রকাশ: ০১:৪৮:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস প্রকাশিত এক হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৫১টি বড় তেল ও গ্যাস কোম্পানির গত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর ছয় মাসের আর্থিক কার্যক্রমের ভিত্তিতে মুনাফার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। পত্রিকাটির এই হিসাবকে রক্ষণশীল মূল্যায়ন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তুলনায়, ২০২৫ সালের একই সময়ে, অর্থাৎ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর আগে যখন তেলের দাম কম ছিল, তখন এসব কোম্পানি সম্মিলিতভাবে ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের কম মুনাফা করেছিল।

তবে তেল কোম্পানিগুলোর এই মুনাফা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় সাধারণ মানুষকে চাপে ফেলছে। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট সলিউশনস ল্যাবের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা পেট্রল ও ডিজেল কিনতে অতিরিক্ত ১৫ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করেছেন। পরিবারপ্রতি এই বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ ১ হাজার ১৫০ ডলারের বেশি।

যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কোম্পানিগুলো বিভিন্নভাবে লাভবান হয়েছে বলে মনে করেন ইতালির মিলানে অবস্থিত ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল স্টাডিজের (আইএসপিআই) ফেলো নাসের আল-তামিমি। তাঁর ভাষায়, ‘অপরিশোধিত তেল উৎপাদকেরা বেশি দামের কারণে লাভবান হচ্ছে। অন্যদিকে, ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির সরবরাহ কমে যাওয়ায় শোধনাগারগুলো অস্বাভাবিক বেশি মুনাফা করছে।’

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম দুই তেল কোম্পানি এক্সনমবিল ও শেভরন ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে মুনাফার কথা জানিয়েছে। মুনাফার এই পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হলেও দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের হিসাব বলছে, সাধারণভাবে তা ২০২২ সালের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ওই বছর ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারে উঠে গিয়েছিল। প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও বেড়েছিল। অন্যদিকে, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তেলের গড় দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার।

মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ কমেছে এবং মজুতও ফুরিয়ে এসেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের তেল পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলোও বেশি মুনাফা করেছে। ভ্যালেরো এনার্জির তৃতীয় প্রান্তিকের মুনাফা আগের তুলনায় ছয় গুণের বেশি বেড়ে ৬৮৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। আর ফিলিপস ৬৬ জানিয়েছে, কোম্পানিটির ইতিহাসে কোনো এক প্রান্তিকে এটাই সর্বোচ্চ মুনাফা। এক বছর আগে একই সময়ে তাদের নিট আয় ছিল ১৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬২ কোটি ডলারে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং গালফ স্টেটস ইনসাইটস নিউজলেটারের সম্পাদক জিওফ্রে মিলার বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ ‘বহু বছরের মধ্যে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহে সবচেয়ে বড় ধাক্কা তৈরি করেছে’।

মিলার আরও বলেন, এই যুদ্ধের ফলে তেলের দামে এমন একটি ঝুঁকিজনিত বাড়তি মূল্য যুক্ত হয়েছে, যা থেকে মুনাফা করার ক্ষেত্রে কাঠামোগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিগুলো। বিপরীতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদকেরা বেশি ব্যয়, নিরাপত্তাঝুঁকি এবং অবকাঠামোর সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। ফলে তেলের দাম বাড়লেও তাদের পক্ষে সেই সুবিধা কাজে লাগানো অনেক কঠিন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত স্বাধীন সংঘাত পর্যবেক্ষণ সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি) জানিয়েছে, ইরান ও অঞ্চলটিতে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো জিসিসির ছয় সদস্যদেশে বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে অন্তত ১৭২টি হামলা চালিয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তাঁদের লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা। তবে এসব হামলায় জ্বালানি অবকাঠামোও আক্রান্ত হয়েছে।

এদিকে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল ও গ্যাসের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে। পাল্টাপাল্টি এসব পদক্ষেপের ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা চলতে পারে। জুনে একটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর গ্রীষ্মকালে কিছু সময়ের জন্য তেলের দাম কমেছিল। কিন্তু আলোচনা ভেঙে পড়ার পর দাম আবার দ্রুত বেড়ে যায়।

এর মধ্যে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা বাব আল-মান্দেব প্রণালিও এখন যুদ্ধের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তেল রপ্তানির জন্য এই জলপথ ব্যবহার করে সৌদি আরব।

জিওফ্রে মিলার বলেন, ‘স্বল্প মেয়াদে আকস্মিকভাবে পাওয়া এই বিপুল মুনাফা তেল কোম্পানিগুলোর আর্থিক ভিত্তি এবং শেয়ারধারীদের আয় আরও শক্তিশালী করবে।’ তবে এই বিপুল মুনাফার সঙ্গে বড় ধরনের ঝুঁকিও রয়েছে। তাঁর মতে, দীর্ঘ মেয়াদে তেলের উচ্চমূল্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এমনকি মন্দা পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। এর ফলে তেলের চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে রূপান্তরের গতি আরও বাড়তে পারে।

লন্ডনে রাবোব্যাংকের বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাজারবিষয়ক দলের জ্যেষ্ঠ জ্বালানি কৌশলবিদ ফ্লোরেন্স শ্মিট মনে করেন, ইরানের যুদ্ধ কত দিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পণ্যের দাম উঁচু পর্যায়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শ্মিট বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে সরবরাহে এই ধাক্কার প্রভাব যেসব বাজারে পড়েছে, যুক্তরাষ্ট্রও তার মধ্যে রয়েছে। এসব বাজারে আগামী বছরও দাম বেশি থাকবে। সরকার হস্তক্ষেপ না করলে ভোক্তাদের ওপর এই মূল্যচাপ অব্যাহত থাকবে।’

ট্রাম্প অবশ্য বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের জন্য ইউক্রেনকে দায়ী করার চেষ্টা করেছেন। রাশিয়ার শোধনাগারগুলোতে হামলা বন্ধ করতে তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর চাপ দিয়েছেন। অথচ মস্কো ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা অব্যাহত রেখেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের যুক্তি, রাশিয়ার সঙ্গে এমন একটি চুক্তি হলে, যার মাধ্যমে কয়েক বছরের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে, ডিজেলের দাম কমতে পারে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে বিশ্লেষকেরা বলছেন, যেসব তেল রপ্তানিকারক দেশ জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পারবে, তারা বেশি দামের কারণে লাভবান হবে। তবে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা ও বিনিয়োগের ওপর হুমকি তৈরি করবে।

আইএসপিআইয়ের নাসের আল-তামিমি বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদক দেশগুলোকে অবকাঠামো পুনর্গঠনে কয়েক বছর সময় দিতে হবে। পাশাপাশি রপ্তানির বিকল্প পথ তৈরির চাপও থাকবে। কূটনৈতিক সমঝোতা হলে দাম কমতে পারে। অন্যদিকে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন করে হামলা হলে আরেকটি আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে হরমুজ প্রণালিতে আবারও বিঘ্ন ঘটতে পারে এবং সরবরাহসংকট দীর্ঘায়িত হতে পারে।’

ফের শান্তি আলোচনা শুরুর সম্ভাবনায় কমল তেলের দাম

ফের শান্তি আলোচনা শুরুর সম্ভাবনায় কমল তেলের দাম

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ফের মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নিয়েছেন। বুধবার দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তা ও আলোচনাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে জানায়, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজাইকে চিঠি পাঠিয়েছেন ভ্যান্স।

পোশাক রপ্তানি বেড়েছে, পিছিয়ে উচ্চমূল্যের পণ্য

পোশাক রপ্তানি বেড়েছে, পিছিয়ে উচ্চমূল্যের পণ্য

দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ আসছে এমন সব পোশাক থেকে, যেগুলো দেশের প্রচলিত রপ্তানি পণ্যের তালিকায় আগে থেকে শীর্ষে রয়েছে। বিপরীতে তুলনামূলক উচ্চমূল্যের পোশাকের রপ্তানি বাড়ছে ধীরগতিতে। কিছু পণ্যের রপ্তানি আবার কমেও গেছে।

এআইতে বদলে যাচ্ছে চীনের কৃত্রিম হীরার বাজার

এআইতে বদলে যাচ্ছে চীনের কৃত্রিম হীরার বাজার

চীনের কৃত্রিম হীরা উৎপাদকেরা গয়না তৈরির বাজারের বাইরে নতুন সম্ভাবনা খুঁজছেন। তীব্র প্রতিযোগিতা ও দাম কমে আসার চাপে তাঁদের লক্ষ্য এখন সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সার্ভার এবং অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তির কাজে ব্যবহারের উপযোগী উন্নত উপকরণ তৈরি। বিশাল এই শিল্পের ভবিষ্যৎ যে শুধু রত্নপাথরের