মজার ব্যাপার হলো, আমরা জীবনের প্রথম দুই-তিন বছরের একটা বিশাল অধ্যায় পার করে আসি, অথচ আজ প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে সেই সোনালী দিনগুলোর একটি টুকরো স্মৃতিও আমাদের মনে থাকে না। মা যখন আপনার প্রথম মুখের বুলি ফোটার আনন্দে আত্মহারা হয়েছিলেন, কিংবা দ্বিতীয় জন্মদিনের কেকের মোমবাতি নেভানোর সেই মিষ্টি মুহূর্ত। সবই যেন এক অদৃশ্য কালসিিতে হারিয়ে গেছে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই রহস্যময় ঘটনার নাম ‘ইনফ্যান্টাইল অ্যামনেসিয়া’ বা শৈশবের স্মৃতিভ্রম। ছোটবেলার স্মৃতি বা ‘ইনফ্যান্টাইল অ্যামনেসিয়া’ সংক্রান্ত এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়েরর গবেষক দল। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে এই গবেষণার ফলাফল বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স’ এ প্রকাশিত হয়েছিল। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক নিক তুর্ক-ব্রাউনের নেতৃত্বে এবং তৎকালীন গ্র্যাজুয়েট ছাত্র ত্রিস্টান ইয়েটসের তত্ত্বাবধানে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছিল।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ছোটবেলার স্মৃতিগুলো হারিয়ে যায় না। বরং সেগুলো মস্তিষ্কের গভীরে ঠিকই জমা থাকে। সমস্যাটা স্মৃতির সঞ্চয় নিয়ে নয়। সমস্যা হলো বড় হয়ে আমরা চাইলেও সেই পুরোনো ফাইলগুলো আর খুলতে পারি না। মস্তিষ্কের গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে থাকা সেই হারিয়ে যাওয়া খাতার গল্প নিয়েই আমরা আমাদের প্রতিদিনের জীবন যাপন করি। সেই খাতায় যুক্ত করি নতুন নতুন স্মৃতি। গবেষকরা ৪ মাস থেকে ২ বছর বয়সী শিশুদের ওপর একটি পরীক্ষা চালিয়েছেন। ফাঙ্গশনাল এমআরআই মেশিনের মাধ্যমে শিশুদের মস্তিষ্ক স্ক্যান করে দেখা গেছে, তারা যখন কোনো নতুন ছবি দেখছিল, তখন তাদের মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস বেশ সক্রিয় ছিল। পরে সেই ছবিগুলো আবার দেখানো হলে শিশুরা আগের ছবির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে ছিল। এখান থেকে প্রমাণিত হয় যে শিশুরা ছবিগুলো চিনতে পারছে এবং তাদের মস্তিষ্ক ঠিকই স্মৃতি তৈরি করছে।
তাহলে প্রশ্ন জাগে, ছোটবেলার সেই স্মৃতিগুলো যদি আসলেই জমা হয়, তবে বড় হয়ে আমরা তা মনে রাখতে পারি না কেন? এ বিষয়ে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিক তুর্ক-ব্রাউন বলেন, এটি অনেকটা রহস্যময় কোনো বইয়ের মতো, যা আমাদের মস্তিষ্কে জমা তো আছে কিন্তু পড়ার চাবিটা আমাদের কাছে নেই। এমনকি ইঁদুরের ওপর চালানো এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা আলো দিয়ে মস্তিষ্কের বিশেষ স্নায়ুপথ উদ্দীপিত করে তাদের হারিয়ে যাওয়া শৈশবের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন।
অবশ্য মস্তিষ্ক পরিপক্ব হওয়া ছাড়াও আরও কিছু কারণ ছোটবেলার স্মৃতি মুছে যাওয়ার পেছনে কাজ করে। যেমন ভাষার অভাব। কারণ ছোটবেলায় আমরা কথা বলতে শিখি না। ফলে জীবনের ঘটনাগুলোকে শব্দ বা গল্পের আকারে সাজিয়ে গুছিয়ে স্মৃতিতে ধরে রাখা তখন কঠিন হয়। আর একটি কারণ হল নিজেকে চেনার বয়স। জীবনের প্রথম বছরগুলোতে আমাদের নিজস্ব কোনো শক্ত আত্মপরিচয় বা 'আমি কে' এই বোধ তৈরি হয় না। এর ফলে স্মৃতি ধরে রাখা সহজ হয় না। সংক্ষেপে বলতে গেলে, আপনি হয়তো আপনার জন্মদিনের কেক কাটার দৃশ্য মনে করতে পারেন না, তার মানে এই নয় যে আপনার মস্তিষ্ক তা রেকর্ড করেনি। আপনার জীবনের প্রথম অধ্যায়ের সেই সুপ্ত স্মৃতিগুলো আজও অবিকল রয়ে গেছে মস্তিষ্কের কোনো গোপন কুঠুরিতে—হয়তো কেবল খোলার চাবিটাই সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে।
সূত্র: সাইকোলজিক্যাল রিভিউ, ব্রেইন্স সায়েন্সেস

দৈনিক টার্গেট 




























