ওষুধের প্রাথমিক ধাক্কায় শরীরের দুর্বল জীবাণুগুলো মারা গেলেও কিছু শক্তিশালী ও সহনশীল ব্যাকটেরিয়া বেঁচে থাকে। ডোজ পূর্ণ না করলে এই টিকে থাকা জীবাণুগুলো ওষুধের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা অর্জন করে নেয়।
বেঁচে যাওয়া ব্যাকটেরিয়াগুলো অতি দ্রুত মিউটেশন বা রূপ পরিবর্তনের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হয়ে বংশবিস্তার করে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে সুপারবাগ বা অপ্রতিরোধ্য বলা হয়। পরে একই রোগ বা সংক্রমণ হলে ওই নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক রোগীর শরীরে আর কোনো কাজ করে না।
প্রথম দফার অসম্পূর্ণ চিকিৎসার ফলে দ্বিতীয় দফায় রোগ দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে ফিরে আসে। তখন সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকে কাজ না হওয়ায় অত্যন্ত শক্তিশালী, ব্যয়বহুল এবং প্রচুর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত রিজার্ভ ক্যাটাগরির এবং থার্ড বা ফোর্থ জেনারেশনের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হয়। অনেক সময় তা-ও ব্যর্থ হয়ে রোগীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।
বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা এএমআরের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইসিডিডিআরবি এবং জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের হাসপাতাল ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোতে আসা রোগীদের একটি বড় অংশে বহু-ওষুধ প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে।
গবেষণার উপাত্ত বলছে, আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রোগীদের প্রায় ৪১ শতাংশের ক্ষেত্রে প্যান-ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স (যা কোনো ওষুধেই মরতে চায় না) এবং সামগ্রিকভাবে প্রায় ৪৬ থেকে ৮৯ শতাংশ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ায় বহুমুখী ওষুধ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়েছে। সাধারণ টাইফয়েড, মূত্রনালির সংক্রমণ কিংবা নিউমোনিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রথম ও দ্বিতীয় সারির বহু অ্যান্টিবায়োটিক এখন কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রির অবাধ সংস্কৃতি এই সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আমাদের করণীয়গুলো হলো—
ডোজ শতভাগ সম্পন্ন করা: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপসর্গ পুরোপুরি সেরে গেলেও নির্ধারিত দিন ও মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স সম্পূর্ণ করতে হবে। নিজের বুদ্ধিতে মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করা যাবে না।
প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি নিষিদ্ধ করা: ফার্মেসি থেকে চিকিৎসকের বৈধ ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির ওপর কঠোর আইনি নজরদারি ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা: সাধারণ ভাইরাল ইনফেকশন বা সর্দি-কাশিতে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো কাজে আসে না। তাই এসব অসুখে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন থেকে বিরত থাকতে হবে।
পশুর চিকিৎসায় নিয়ন্ত্রণ: গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির ফিডে অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার রোধ করতে হবে, যা খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানবদেহে রেজিস্ট্যান্স তৈরি করছে।
অ্যান্টিবায়োটিক শুধু ব্যক্তিগত কোনো ওষুধের নাম নয়, এটি মানবজাতিকে বাঁচিয়ে রাখার একটি যৌথ সম্পদ। এই সম্পদের অপব্যবহার রোধে এখনই সচেতন না হলে ভবিষ্যৎ বিশ্বে সামান্য কাটাছেঁড়াও মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
-636a3e-256x144.webp)
দৈনিক টার্গেট 























