যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক জে ক্লেটন গত শুক্রবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাঠানো এক স্মারকলিপিতে এ হুমকির বিষয়ে সতর্ক করেন। এতে বলা হয়, মার্কিন কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যসহ আরও কয়েকটি দেশে মার্কিন নাগরিকদের হত্যার উদ্দেশ্যে হামলার পরিকল্পনা এখন উন্নত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
শুক্রবার রাতে একজন মার্কিন কর্মকর্তার মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন স্মারকলিপিটির বিষয়বস্তু নিশ্চিত করে। এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও আরও কয়েকটি দেশে আমেরিকানদের ওপর হামলার হুমকি এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর শীর্ষ সহযোগীদের নিয়মিতভাবে ক্রমবর্ধমান হুমকি সম্পর্কে অবহিত করা হচ্ছে। গত তিন সপ্তাহ ধরে গোয়েন্দা বিশ্লেষকেরা মার্কিন কর্মকর্তাদের, বিশেষ করে বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতদের লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার তথ্য পরীক্ষা করছেন। কিছু গোয়েন্দা তথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ইরানের এজেন্ট থাকার সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ইউরোপের কয়েকটি স্থানও ইরানের সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
তবে আরেকজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশের বিভিন্ন ভূখণ্ডে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা সীমিত। হামলার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকলেও তা বাস্তবায়নের সামর্থ্য তুলনামূলকভাবে কম। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করেনি। জে ক্লেটনের দপ্তর এবং মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দূতাবাসগুলোতে কর্মী মোতায়েনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে পাওয়া নতুন তথ্য নিয়মিত মূল্যায়ন করা হয়। ইয়েমেনে হুতি বাহিনীর সম্ভাব্য হামলা এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইরানের সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনার তথ্য দূতাবাসগুলোতে কর্মীসংখ্যা সমন্বয়ের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
ওই কর্মকর্তা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশনগুলো আগে থেকেই ‘সীমিত কার্যক্রমের অবস্থা’ বা ‘রেস্ট্রিকটেড অপারেটিং স্ট্যাটাস’-এর অধীনে রয়েছে। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সাধারণত এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর ফলে পরিস্থিতি অনুযায়ী দূতাবাসগুলোতে কর্মীসংখ্যা পরিবর্তন করা সহজ হয়।
ট্রাম্প ও ইসরায়েলের শুরু করা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আট মাস পেরিয়ে গেছে। এ যুদ্ধে জ্বালানির দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি অস্থির হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ট্রাম্পের জনসমর্থনও কমেছে। গত বুধবার নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালানোর পরিকল্পনা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তবে ট্রাম্প এখনো এ হামলা চালানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।
গত কয়েক মাসে ইরানের ওপর বড় পরিসরে হামলার নির্দেশ দেওয়া থেকে বিরত রয়েছেন ট্রাম্প। তবে বিশ্ববাজারে ইরানের তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য বিক্রি বন্ধ রাখার উদ্দেশ্যে দেশটির বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত হানার বিভিন্ন উপায় খুঁজছে ইরান। অক্টোবরে ইরানের সম্ভাব্য হামলার হুমকি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার পর দক্ষিণ ইংল্যান্ডের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর ১২টি বি-১ বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়া হয়। সামরিক কমান্ডাররা ওই ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলার হুমকি সম্পর্কে তথ্য পেয়েছিলেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, একসঙ্গে ওই ১২টি বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি ছিল নজিরবিহীন।
শুক্রবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাঠানো স্মারকলিপিতে জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক জে ক্লেটন জানান, কিছু গোয়েন্দা তথ্যের গোপনীয়তার স্তর কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন তিনি। এর ফলে মার্কিন সরকারের আরও বেশি কর্মীকে সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে জানানো সম্ভব হবে।
স্মারকলিপির বিষয়বস্তুর শিরোনামে মধ্যপ্রাচ্যসহ কয়েকটি দেশে আমেরিকানদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী হামলার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ক্লেটনের উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো, এসব হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে সরকারের আরও বেশি কর্মীকে অবহিত করা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর পাল্টা জবাব দেয় ইরানের সামরিক বাহিনী। তারা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আরব দেশ এবং ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে। এরপর ২ মার্চ ইরাক, জর্ডান ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলোতে কর্মরত অপ্রয়োজনীয় কর্মীদের বাধ্যতামূলকভাবে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
প্রায় একই সময়ে সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলো থেকেও অপ্রয়োজনীয় কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশ ছাড়তে বলা হয়। এর কারণ ছিল, ইরান রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস এবং তার আশপাশের এলাকায় হামলা চালিয়েছিল।
যুদ্ধ শুরুর আগে মাত্র দুটি মার্কিন দূতাবাসের কর্মীদের স্বেচ্ছায় কর্মস্থল ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘অথরাইজড ডিপারচার’। এর আওতায় অপ্রয়োজনীয় কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা চাইলে নিজ উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট এলাকা ছেড়ে যেতে পারেন। দূতাবাস দুটি ছিল বৈরুত ও জেরুজালেমে। বৈরুতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস যুদ্ধ শুরুর চার দিন আগে এ অনুমতি দেয়। জেরুজালেমের দূতাবাস একই ধরনের অনুমতি দেয় যুদ্ধ শুরুর আগের দিন।
চলতি গ্রীষ্মে সংঘাতের তীব্রতা কিছু সময়ের জন্য কমে এলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কয়েকজন কূটনীতিককে তাঁদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়।

দৈনিক টার্গেট 



























