স্লিপ অ্যান্ড ড্রিম ডেটাবেইসের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
১৬ হাজার মানুষের বর্ণনা করা স্বপ্ন নিয়ে সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারীদের স্বপ্নের মাত্র ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং পুরুষদের স্বপ্নের ২ দশমিক ৬৯ শতাংশে ফোনের উল্লেখ রয়েছে। তরুণদের স্বপ্নে বয়স্কদের তুলনায় প্রযুক্তির উপস্থিতি কিছুটা বেশি হলেও তা সামগ্রিকভাবে খুবই কম।
স্বপ্ন গবেষক এবং স্লিপ অ্যান্ড ড্রিম ডেটাবেইসের পরিচালক ড. কেলি বুলকলে বলেন, দৈনন্দিন জীবনে প্রায় সর্বব্যাপী হয়ে ওঠা মোবাইল ফোন স্বপ্নে এত কম দেখা যাওয়ার বিষয়টি বিস্ময়কর। সাধারণত মানুষের জাগ্রত জীবনের অভিজ্ঞতা ও আবেগের প্রতিফলন ঘটে স্বপ্নে। সে বিবেচনায় ফোনের এমন অনুপস্থিতি গবেষকদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ড. বুলকলের মতে, মানুষ ফোনের বস্তুগত অস্তিত্বের চেয়ে ফোনের মাধ্যমে পাওয়া অভিজ্ঞতা ও সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেয়। এ কারণেই স্বপ্নে ফোনের কার্যকর ব্যবহারের চেয়ে হারিয়ে যাওয়া কিংবা বিকল হয়ে যাওয়ার ঘটনা বেশি দেখা যেতে পারে। কারণ, ফোন হারানোর আশঙ্কা মানুষের মধ্যে তুলনামূলক বেশি উদ্বেগ তৈরি করে।
আরেকটি ব্যাখ্যা এসেছে ‘কমপেনসেশন হাইপোথিসিস’ বা ক্ষতিপূরণ তত্ত্ব থেকে। লিংকন বিশপ ইউনিভার্সিটির ঘুম ও মস্তিষ্কের কার্যক্রমবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ক্যারোলিন হোলটনের মতে, দিনের কোনো ঘটনা যদি মানুষকে উদ্বিগ্ন করে, অথচ সেটি নিয়ে যথেষ্ট চিন্তার সুযোগ না পায়, তাহলে মস্তিষ্ক ঘুমের মধ্যে সেই অভিজ্ঞতা প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। কিন্তু কেউ যদি দিনের আট ঘণ্টা কম্পিউটারের সামনে কাটান, তাহলে স্বপ্নেও একই বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকার প্রয়োজন নাও হতে পারে।
স্বপ্নে ফোন দেখা গেলেও আরেকটি অদ্ভুত সমস্যা দেখা যায়। ফোনের পর্দায় স্বাভাবিক লেখা বা বার্তার পরিবর্তে অনেক সময় অর্থহীন আঁকিবুঁকি কিংবা অস্পষ্ট চিহ্ন দেখা যায়। স্বপ্নে বই পড়া, লেখা বা টাইপ করার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা ঘটে। কারণ, এসব কাজের জন্য যে যুক্তিনির্ভর ও সূক্ষ্ম চিন্তাশক্তি প্রয়োজন, ঘুমের মধ্যে মস্তিষ্কের সেই অংশগুলো তুলনামূলক কম সক্রিয় থাকে।
অধ্যাপক হোলটন বলেন, স্বপ্ন দেখার সময় মস্তিষ্কের কার্যক্রম অনেক বেশি সৃজনশীল ও আবেগনির্ভর হয়ে ওঠে; যুক্তি ও খুঁটিনাটি বিবরণের ওপর মনোযোগ কমে যায়। ফলে স্বপ্নে ফোনের পর্দা দেখা গেলেও সেটির লেখা পড়া কিংবা স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা কঠিন হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, স্বপ্নের এই বৈশিষ্ট্য ঘুমের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য সম্পর্কেও ধারণা দিতে পারে। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক স্মৃতি সংরক্ষণ, শেখা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন সংযোগ তৈরি ও পুনর্গঠন করে। এমনকি স্বপ্নের কাল্পনিক পরিস্থিতি বাস্তব জীবনের সম্ভাব্য বিপদ বা সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবেও কাজ করতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
অর্থাৎ, স্বপ্ন হয়তো জাগ্রত জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি পুনরাবৃত্তি করার জন্য নয়। বরং দৈনন্দিন বাস্তবতা থেকে সাময়িক বিচ্ছিন্ন হয়ে মস্তিষ্কের নিজস্ব প্রক্রিয়ায় আবেগ ও অভিজ্ঞতা সাজিয়ে নেওয়ার একটি ক্ষেত্র। সেই কারণেই হয়তো আমাদের হাতের সবচেয়ে কাছের যন্ত্রটিও স্বপ্নের জগতে প্রায় অনুপস্থিত।

দৈনিক টার্গেট 


























