টেলিভিশন সাংবাদিকতা থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণে আসা বিনোদ কাপরির পরিচালনায় ১১১ মিনিটের এই ছবিতে উঠে এসেছে হিমালয়ের পাহাড়ি জনপদের এক কঠিন বাস্তবতা। কাজের সন্ধানে একের পর এক মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যাচ্ছে। ফলে একসময়ের সুন্দর ও জনবসতিপূর্ণ গ্রামগুলো এখন পরিণত হচ্ছে জনশূন্য জনপদে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বদলে দিচ্ছে পাহাড়ি অঞ্চলের আবহাওয়া।
‘পায়ার’-এর কেন্দ্রীয় দুই চরিত্র পদ্ম সিং ও তুলসী। স্থানীয় ভাষায় তাঁদের ‘বুবু’ ও ‘আমা’ বলে ডাকা হয়, যার অর্থ দাদা ও দাদি। উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি অঞ্চলের একটি ছোট্ট বাড়িতে তাঁদের বসবাস। পদ্ম সিং চরিত্রে অভিনয় করেছেন পরিচালক বিনোদ কাপরির চাচা পদ্ম সিং। আর তুলসীর ভূমিকায় হীরা দেবী।
এই দম্পতির সংসারজীবন ৬৫ বছরের। তাঁদের একমাত্র ছেলে হারিয়া কাজের সন্ধানে ২৮ বছর আগে মুম্বাইয়ে চলে গেছেন। এরপর থেকে ছেলের ফেরার অপেক্ষায় দিন কাটছে তাঁদের।
বিবিসিকে পরিচালক বিনোদ কাপরি বলেন, ‘এটি ভালোবাসা, নিঃসঙ্গতা আর অপেক্ষার গল্প।’ তাঁর ভাষায়, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছানো এক দম্পতির গভীর ভালোবাসাই ছবিটির মূল বিষয়।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর একদিন হঠাৎ ছেলের চিঠি আসে। চিঠিতে বাড়ি ফেরার তারিখ জানান হারিয়া। নতুন করে আশায় বুক বাঁধেন পদ্ম সিং ও তুলসী। শুরু হয় ছেলের ফেরার দিন গোনার পালা।
কিন্তু তাঁদের অপেক্ষার দিনগুলো সহজ ছিল না। একে একে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে থাকে আশপাশের বাসিন্দারা। একসময় বিশাল পাহাড়ি জনপদে একা হয়ে পড়েন এই বৃদ্ধ দম্পতি।
এমন এক পাহাড়ি গ্রামের জীবন, যেখানে নেই পাকা রাস্তা, নেই বিদ্যুৎ-সংযোগ। প্রয়োজনের সময় সাহায্য পাওয়াও কঠিন। তুলসীকে প্রায়ই হাসপাতালে নিতে হয়। তখন পদ্ম সিং ঐতিহ্যবাহী শিঙা বাজিয়ে প্রতিবেশীদের ডাকেন। তাঁরা সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলে কৃতজ্ঞতা জানাতে ছাগল উপহার দেন তিনি।
এক চরিত্রের ভাষায়, ‘এখানে কিছুই নেই, শুধু পাহাড়।’ উন্নত জীবনের আশায় তাই তরুণেরা গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যান। একবার চলে গেলে তাঁদের অধিকাংশই আর ফিরে আসেন না।
বিদায়ের আগে এক গ্রামবাসী পদ্ম সিংকে পরামর্শ দেন, তাঁরাও যেন দ্রুত গ্রাম ছেড়ে চলে যান। কারণ, তাঁদের কেউ মারা গেলে মরদেহ পাহাড় থেকে নামিয়ে সৎকার করার মতো চারজন মানুষও হয়তো পাওয়া যাবে না। কথাটি ঠাট্টার ছলে বললেও এর মধ্যে লুকিয়ে ছিল পাহাড়ি জনপদের কঠিন বাস্তবতা।
এই বাস্তবতা বুঝতে পেরে পদ্ম সিং বাড়ির দরজার সামনেই পাশাপাশি দুটি চিতা তৈরি করেন। একটি নিজের জন্য, অন্যটি স্ত্রীর জন্য। কেন এমন ব্যবস্থা করছেন, জানতে চাইলে তিনি তুলসীকে বলেন, ‘তুমি মারা গেলে তোমার মরদেহ পাহাড় থেকে একা কীভাবে নামাব?’
বিষণ্নতা ও নিঃসঙ্গতার গল্প হলেও ছবিতে হাস্যরসের অভাব নেই। দীর্ঘদিনের সংসারজীবনের মতোই পদ্ম সিং ও তুলসীর খুনসুটি, ছোটখাটো ঝগড়া আর একে অপরের প্রতি নির্ভরতা ছবিটিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
২০১৮ সালে উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি শহর মুন্সিয়ারিতে ৮৪ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের সঙ্গে দেখা হয় বিনোদ কাপরির। ফেসবুকে ওই বৃদ্ধের ছবি দেখে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন তিনি।
কাপরি বলেন, ‘তাঁর মুখের বলিরেখা আমাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছিল। চেহারায় ছিল আলাদা এক বৈশিষ্ট্য।’
সাক্ষাতের সময় বৃদ্ধ দম্পতির কাছে তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কথা জানতে চান কাপরি। বৃদ্ধের উত্তর ছিল, ‘আমি যদি আগে মারা যাই, তাহলে আমার স্ত্রীর দেখাশোনা কে করবে?’ অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী বলেন, ‘তিনি তো রান্না করতে জানেন না। আমি আগে মারা গেলে তাঁর জন্য রান্না করবে কে?’
দম্পতির এই কথাগুলো গভীরভাবে ছুঁয়ে যায় কাপরিকে। সেখান থেকেই ছবিটি নির্মাণের ভাবনা আসে তাঁর মাথায়।
চিত্রনাট্য পছন্দ হলেও শাহ মনে করেছিলেন, তাঁরা ওই অঞ্চলের মানুষ নন। তাই চরিত্র দুটির প্রতি যথাযথ সুবিচার করা তাঁদের জন্য কঠিন হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত নিজের পরিবারের মধ্যেই পদ্ম সিং চরিত্রের অভিনেতাকে খুঁজে পান কাপরি— তিনি তাঁর বাবার ছোট ভাই, একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য। অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ থাকায় তাঁকেই বেছে নেন এই চরিত্রের জন্য।
অন্যদিকে তুলসী চরিত্রের জন্য পাশের একটি গ্রাম থেকে বেছে নেন হীরা দেবীকে। বয়স্ক এই বিধবা নারী বছরের পর বছর কৃষিকাজ, ঘাস কাটা ও মহিষের দেখাশোনা করে সন্তানদের বড় করেন। এর আগে কখনো ক্যামেরার সামনে দাঁড়াননি তিনি।
বিবিসিকে পদ্ম সিং ও হীরা দেবী জানান, তাঁদের আশপাশের গ্রামগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই মানুষ বসতি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। কাজের সন্ধানে সন্তানদের অন্যত্র চলে যাওয়া এবং বৃদ্ধ মা-বাবার একা হয়ে পড়ার ঘটনাও তাঁদের পরিচিত। ‘পায়ার’ ছবিতে সেই বাস্তবতাই উঠে এসেছে। ছবিটি ঘিরে এত প্রশংসা পেয়ে তাঁরা দুজনই অভিভূত।
শুরুতে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো ও সংলাপ মনে রাখা নিয়ে দুজনেরই কিছুটা ভয় ছিল। হীরা দেবী ভেবেছিলেন, তাঁর সন্তান ও সমাজ বিষয়টি কীভাবে নেবে। তবে দর্শকদের ভালোবাসা ও প্রশংসায় এখন সেই দ্বিধা অনেকটাই কেটে গেছে।
তবে উৎসবে সাফল্য পেলেও ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দিতে রাজি হচ্ছিলেন না পরিবেশকেরা। কাপরি জানান, প্রায় দুই বছর ধরে ছবিটির জন্য কোনো পরিবেশক পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্মও ছবিটি ফিরিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত তাঁর এক প্রযোজক বন্ধু প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির জন্য অর্থায়নে এগিয়ে আসেন।
গত ৩০ অক্টোবর মাত্র ৭০টি প্রেক্ষাগৃহে সীমিত পরিসরে মুক্তি পায় ‘পায়ার’। শুরু থেকেই দর্শকদের ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়। বাড়তে থাকে টিকিটের চাহিদা। ফলে ধীরে ধীরে ছবিটির প্রদর্শনীর সংখ্যাও বাড়ানো হয়।
একসময় যে ছবির মুক্তি নিয়েই অনিশ্চয়তা ছিল, সেই ছবিই এখন দর্শকদের আবেগ ছুঁয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের একটি ছোট্ট বাড়িতে থাকা বৃদ্ধ দম্পতির গল্পের মধ্য দিয়ে ‘পায়ার’ মনে করিয়ে দিচ্ছে, ভালোবাসা শুধু একসঙ্গে থাকার নাম নয়; কখনো কখনো একে অপরের পাশে থাকার অপেক্ষাটুকুই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন।
-3c2e4d-256x144.webp)
দৈনিক টার্গেট 

























