১০:১৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডার্ক ট্যুরিজম কেবল রোমাঞ্চ নয়, ইতিহাসের ভিন্ন পাঠ

  • দৈনিক টার্গেট
  • প্রকাশ: ০৬:৪৩:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১০৪ বার পঠিত হয়েছে

উনিশ শতকের সেই অদ্ভুত ও কিছুটা বিকৃত কৌতূহল কিন্তু ইতিহাস থেকে মুছে যায়নি। আধুনিক যুগে এসে সেই আগ্রহই জন্ম দিয়েছে এক নতুন আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ধারা, যাকে বলা হচ্ছে ডার্ক ট্যুরিজম। অ্যাডভেঞ্চার ও থ্রিল-সন্ধানী একদল ভিন্নধর্মী পর্যটক এখন আর সমুদ্রসৈকত বা কোনো বিখ্যাত শহরের রাস্তায় ঘোরে না। তাদের গন্তব্য এখন পারমাণবিক তেজস্ক্রিয় এলাকা, যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদ কিংবা অভিশপ্ত কোনো স্মৃতিচিহ্ন।

পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্ধকারের এই ভ্রমণের রূপ মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটি হয় বিপজ্জনক ও সংঘাতপূর্ণ দেশগুলোতে। যেমন মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট যে দেশগুলোকে ‘ডু নট ট্রাভেল’ বা ভ্রমণ অনুপযোগী বলে চিহ্নিত করেছে, সেসব দেশে। উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান, সুদান, চাদ কিংবা হাইতি হতে পারে সে গন্তব্য। আর একটি হলো অভিশপ্ত বা ট্র্যাজিক কোনো জায়গায় ভ্রমণ। যেখানে কোনো এক সময়ে ঘটে গেছে নারকীয় হত্যাকাণ্ড বা ট্র্যাজেডি। যেমন কম্বোডিয়ার কিলিং ফিল্ডস, ইউক্রেনের চেরনোবিল কিংবা গায়ানার জন্সটাউন, যেখানে ১৯৭৮ সালে ৯ শতাধিক মানুষ আত্মহত্যা করেছিল।

ভ্রমণ তালিকায় এসব দেশ যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এখন সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবও কম নয়। ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকে কিছুটা ভিন্নধর্মী ও চমকপ্রদ কনটেন্ট দেওয়ার প্রতিযোগিতা তরুণ প্রজন্মকে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, মানুষ কেন সাধ করে নিজের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে এসব জায়গায় যাবে? এই বিষয়ে লুক্সেমবার্গের অভিজ্ঞ পর্যটক আরনল্ড কারবি সিএনএনকে বলেছেন, ‘আমার প্রধান অনুপ্রেরণা হলো ইতিহাস। ইতিহাস বইয়ে কোনো জায়গার কথা পড়া আর সেখানে নিজে গিয়ে তার জটিল পটভূমি প্রত্যক্ষ করার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে।’ মার্কিন ও ব্রিটিশ প্রশাসনের জারি করা লাল সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেই তিনি ঘুরে এসেছেন চাদ ও সিরিয়ার মতো সংঘাতময় এলাকা। চাদের জাকুমা ন্যাশনাল পার্কের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, সেখানকার বন্য হাতির দল গাড়ির শব্দে পালিয়ে না গিয়ে বরং কৌতূহলী হয়ে গাড়ির কাছে চলে আসে, যা কেবল এমন অনাবিষ্কৃত জায়গাতেই সম্ভব। এ ধরনের পর্যটকের অনেকেই মনে করে, পশ্চিমা গণমাধ্যমে কোনো দেশকে যেভাবে ‘ভয়ংকর’ বা ‘খলনায়ক’ বানিয়ে উপস্থাপন করা হয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা তার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর কোরিয়ার মতো জায়গায় গিয়ে আরনল্ড স্থানীয়দের যে অপূর্ব আতিথেয়তা ও উষ্ণতা পেয়েছেন, তা তাঁর জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছে। যদিও এই রোমাঞ্চের পথ সব সময় মসৃণ হয় না।

ডার্ক ট্যুরিজম কেবল বাকেট লিস্টের টিকচিহ্ন নয়। এটি মানবতার সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোকে বোঝার অন্যতম মাধ্যম। লেখক এইচ ই সোয়্যার চেরনোবিল থেকে শুরু করে নাৎসিদের বধ্যভূমি অস্ট্রিয়ার হার্টহেইম ক্যাসেল ভ্রমণ করে উপলব্ধি করেছেন, স্মৃতিসৌধগুলো কীভাবে সমাজ ও ইতিহাসের রূপ বদলে দেয়। সম্প্রতি গায়ানার জন্সটাউনে স্থানীয় গাইডদের সাহায্যে শুরু হয়েছে এই এডুকেশনাল ট্যুরিজম, যা মানুষকে সাইকোলজি ও ইতিহাসের এক ভিন্ন পাঠ শেখায়। প্রতিটি দেশেরই কিছু না কিছু দেওয়ার আছে। দৃষ্টিভঙ্গি বদলে এসব বিপজ্জনক বা অন্ধকার ইতিহাস ছোঁয়া জায়গাগুলোতে পা রাখার পেছনে কাজ করে অদম্য কৌতূহল আর ইতিহাস নিজের চোখে স্পর্শ করার এক অদ্ভুত তীব্র বাসনা। ডার্ক ট্যুরিজম তাই কেবল রোমাঞ্চ নয়, বরং মানবতার অন্ধকার থেকে শিক্ষা নিয়ে আলোতে ফেরার এক অন্য রকম যাত্রা।

ভ্রমণপ্রেমী নারীরা আজকাল বিভিন্ন ট্রাভেল গ্রুপের সঙ্গে ট্য়ুরে যাচ্ছেন। আমাদের নারীভিত্তিক অনেক ট্রাভেল গ্রুপ বিশ্বস্ততা অর্জন করেছে এরই মধ্যে। তবে প্রথমবারের মতো অচেনা মানুষদের সঙ্গে গ্রুপে ভ্রমণে গেলে আনন্দ বজায় রাখার পাশাপাশি নিজের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে কিছু বিষয় মেনে চলতে হবে।

অবশেষে এ বছর মিনমিনে উচ্চারণে কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করল, ‘সমাপ্ত’। এই একটি শব্দ শোনার জন্য পৃথিবীর মানুষদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৪৪ বছর। খুব জাঁকজমক করে উদ্বোধনও করা হলো। অথচ আজও শেষ হয়নি এর নির্মাণকাজ। যাঁর হাত ধরে শুরু হয়েছিল, সেই বিশ্বখ্যাত স্থপতি আন্তোনি গাউদিও গত হয়েছেন; তা-ও এক শতাব্দী হয়ে গেছে।

ছুটি মানেই তো একটু পা ছড়িয়ে দেওয়া, আড্ডা আর ঝিমোনো, তাই না? কিন্তু টিকটক আর ইউটিউব শর্টসের যুগে ভ্রমণ জিনিসটি এখন যেন অলিখিত এক অলিম্পিক প্রতিযোগিতা। ভোর ৪টায় উঠে সূর্যোদয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতেই হবে। অনেক সময় ক্লান্ত থাকলেও ক্যামেরার সামনে মুখে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে ভিডিও করা কিংবা ছবি তোলা।

জনপ্রিয় টার্গেট

টিভিতে আজ কোথায় কোন খেলা দেখবেন

ডার্ক ট্যুরিজম কেবল রোমাঞ্চ নয়, ইতিহাসের ভিন্ন পাঠ

প্রকাশ: ০৬:৪৩:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উনিশ শতকের সেই অদ্ভুত ও কিছুটা বিকৃত কৌতূহল কিন্তু ইতিহাস থেকে মুছে যায়নি। আধুনিক যুগে এসে সেই আগ্রহই জন্ম দিয়েছে এক নতুন আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ধারা, যাকে বলা হচ্ছে ডার্ক ট্যুরিজম। অ্যাডভেঞ্চার ও থ্রিল-সন্ধানী একদল ভিন্নধর্মী পর্যটক এখন আর সমুদ্রসৈকত বা কোনো বিখ্যাত শহরের রাস্তায় ঘোরে না। তাদের গন্তব্য এখন পারমাণবিক তেজস্ক্রিয় এলাকা, যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদ কিংবা অভিশপ্ত কোনো স্মৃতিচিহ্ন।

পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্ধকারের এই ভ্রমণের রূপ মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটি হয় বিপজ্জনক ও সংঘাতপূর্ণ দেশগুলোতে। যেমন মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট যে দেশগুলোকে ‘ডু নট ট্রাভেল’ বা ভ্রমণ অনুপযোগী বলে চিহ্নিত করেছে, সেসব দেশে। উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান, সুদান, চাদ কিংবা হাইতি হতে পারে সে গন্তব্য। আর একটি হলো অভিশপ্ত বা ট্র্যাজিক কোনো জায়গায় ভ্রমণ। যেখানে কোনো এক সময়ে ঘটে গেছে নারকীয় হত্যাকাণ্ড বা ট্র্যাজেডি। যেমন কম্বোডিয়ার কিলিং ফিল্ডস, ইউক্রেনের চেরনোবিল কিংবা গায়ানার জন্সটাউন, যেখানে ১৯৭৮ সালে ৯ শতাধিক মানুষ আত্মহত্যা করেছিল।

ভ্রমণ তালিকায় এসব দেশ যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এখন সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবও কম নয়। ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকে কিছুটা ভিন্নধর্মী ও চমকপ্রদ কনটেন্ট দেওয়ার প্রতিযোগিতা তরুণ প্রজন্মকে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, মানুষ কেন সাধ করে নিজের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে এসব জায়গায় যাবে? এই বিষয়ে লুক্সেমবার্গের অভিজ্ঞ পর্যটক আরনল্ড কারবি সিএনএনকে বলেছেন, ‘আমার প্রধান অনুপ্রেরণা হলো ইতিহাস। ইতিহাস বইয়ে কোনো জায়গার কথা পড়া আর সেখানে নিজে গিয়ে তার জটিল পটভূমি প্রত্যক্ষ করার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে।’ মার্কিন ও ব্রিটিশ প্রশাসনের জারি করা লাল সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেই তিনি ঘুরে এসেছেন চাদ ও সিরিয়ার মতো সংঘাতময় এলাকা। চাদের জাকুমা ন্যাশনাল পার্কের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, সেখানকার বন্য হাতির দল গাড়ির শব্দে পালিয়ে না গিয়ে বরং কৌতূহলী হয়ে গাড়ির কাছে চলে আসে, যা কেবল এমন অনাবিষ্কৃত জায়গাতেই সম্ভব। এ ধরনের পর্যটকের অনেকেই মনে করে, পশ্চিমা গণমাধ্যমে কোনো দেশকে যেভাবে ‘ভয়ংকর’ বা ‘খলনায়ক’ বানিয়ে উপস্থাপন করা হয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা তার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর কোরিয়ার মতো জায়গায় গিয়ে আরনল্ড স্থানীয়দের যে অপূর্ব আতিথেয়তা ও উষ্ণতা পেয়েছেন, তা তাঁর জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে দিয়েছে। যদিও এই রোমাঞ্চের পথ সব সময় মসৃণ হয় না।

ডার্ক ট্যুরিজম কেবল বাকেট লিস্টের টিকচিহ্ন নয়। এটি মানবতার সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোকে বোঝার অন্যতম মাধ্যম। লেখক এইচ ই সোয়্যার চেরনোবিল থেকে শুরু করে নাৎসিদের বধ্যভূমি অস্ট্রিয়ার হার্টহেইম ক্যাসেল ভ্রমণ করে উপলব্ধি করেছেন, স্মৃতিসৌধগুলো কীভাবে সমাজ ও ইতিহাসের রূপ বদলে দেয়। সম্প্রতি গায়ানার জন্সটাউনে স্থানীয় গাইডদের সাহায্যে শুরু হয়েছে এই এডুকেশনাল ট্যুরিজম, যা মানুষকে সাইকোলজি ও ইতিহাসের এক ভিন্ন পাঠ শেখায়। প্রতিটি দেশেরই কিছু না কিছু দেওয়ার আছে। দৃষ্টিভঙ্গি বদলে এসব বিপজ্জনক বা অন্ধকার ইতিহাস ছোঁয়া জায়গাগুলোতে পা রাখার পেছনে কাজ করে অদম্য কৌতূহল আর ইতিহাস নিজের চোখে স্পর্শ করার এক অদ্ভুত তীব্র বাসনা। ডার্ক ট্যুরিজম তাই কেবল রোমাঞ্চ নয়, বরং মানবতার অন্ধকার থেকে শিক্ষা নিয়ে আলোতে ফেরার এক অন্য রকম যাত্রা।

ভ্রমণপ্রেমী নারীরা আজকাল বিভিন্ন ট্রাভেল গ্রুপের সঙ্গে ট্য়ুরে যাচ্ছেন। আমাদের নারীভিত্তিক অনেক ট্রাভেল গ্রুপ বিশ্বস্ততা অর্জন করেছে এরই মধ্যে। তবে প্রথমবারের মতো অচেনা মানুষদের সঙ্গে গ্রুপে ভ্রমণে গেলে আনন্দ বজায় রাখার পাশাপাশি নিজের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে কিছু বিষয় মেনে চলতে হবে।

অবশেষে এ বছর মিনমিনে উচ্চারণে কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করল, ‘সমাপ্ত’। এই একটি শব্দ শোনার জন্য পৃথিবীর মানুষদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৪৪ বছর। খুব জাঁকজমক করে উদ্বোধনও করা হলো। অথচ আজও শেষ হয়নি এর নির্মাণকাজ। যাঁর হাত ধরে শুরু হয়েছিল, সেই বিশ্বখ্যাত স্থপতি আন্তোনি গাউদিও গত হয়েছেন; তা-ও এক শতাব্দী হয়ে গেছে।

ছুটি মানেই তো একটু পা ছড়িয়ে দেওয়া, আড্ডা আর ঝিমোনো, তাই না? কিন্তু টিকটক আর ইউটিউব শর্টসের যুগে ভ্রমণ জিনিসটি এখন যেন অলিখিত এক অলিম্পিক প্রতিযোগিতা। ভোর ৪টায় উঠে সূর্যোদয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতেই হবে। অনেক সময় ক্লান্ত থাকলেও ক্যামেরার সামনে মুখে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে ভিডিও করা কিংবা ছবি তোলা।